আজ ৪ আগস্ট। মাগুরার ইতিহাসের এক রক্তাক্ত দিন। ২০২৪ সালের এই দিনে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন মাগুরায় রূপ নেয় তীব্র গণআন্দোলনে। প্রাণ হারান চার তরুণ। ঢাকা ও সাভারে আন্দোলনে মারা যান আরও ছয়জন।
১০ শহিদ পরিবার আজও শোকে পাথর। স্বজনদের কান্না থামছেই না। একবছর পেরিয়ে গেলেও কোনো হত্যার বিচার শুরু হয়নি। এ নিয়ে সব শহিদ পরিবার হতাশ।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালী ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাব্বি (২৬)। তিনি পৌর এলাকার বরুনাতৈল গ্রামের মৃত ময়েন উদ্দিনের ছেলে।
এর কিছু সময় পরই একই স্থানে গুলিতে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রীপুর উপজেলার রায়নগর গ্রামের ফরহাদ হোসেন (২২)। একই দিনে মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলায় বিক্ষোভ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হন আব্দুল আহাদ বিশ্বাস (১৭) ও সুমন শেখ (১৮)।
আহাদ ছিলেন আমিনুর রহমান বিএম কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। তার বাড়ি মহম্মদপুর উপজেলার ব্যাপারীপাড়ায়। আর সুমন শেখ একই উপজেলার বালিদিয়া গ্রামের কান্নু শেখের ছেলে এবং মহম্মদপুর আদর্শ টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের শিক্ষার্থী।
একবছর পরও বিচার শুরু হয়নি জেলা ছাত্রদল নেতা ও নিহত রাব্বির সহকর্মী শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, ‘আমার চোখের সামনে রাব্বি ও ফরহাদ গুলিবিদ্ধ হন। আজ একবছর হয়ে গেল, কিন্তু কোনো বিচার শুরু হলো না। কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। আমরা আজও সেই ভয়াবহ দিনের দুঃস্বপ্ন বয়ে বেড়াচ্ছি। নিহতদের পরিবার বলছে, প্রশাসনের দ্বারে ঘুরেও কোনো জবাব পাননি তারা। মামলায় তদন্তের অগ্রগতিও নেই।
ঢাকায়ও নিহত মাগুরার তিন তরুণ ঢাকার আন্দোলনে গুলিতে নিহত হন মাগুরার আরও তিনজন। তারা হলেন রাজু আহমেদ (২৪), মুসতাকিন বিল্লাহ (২৮) ও আসিফ ইকবাল রাব্বি (৩৪)। রাজু আজমপুর গ্রামের সন্তান। ঢাকায় কুরিয়ার সার্ভিসে কাজ করতেন। মুসতাকিন শ্রীপুর উপজেলার বরইচারা
গ্রামের বাসিন্দা, মিরপুরে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চাকরি করতেন। রাব্বির বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার নহাটা গ্রামে। ঢাকার একটি বায়িং হাউসে কাজ করতেন। তিনজনই ১৯ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকার আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। রাজুর মা বলেন, ‘ছেলেটা সংসারের হাল ধরেছিল। তার মৃত্যুতে আমরা ভেঙে পড়েছি। আমরা হত্যার বিচার চাই।
ঢাকার রামপুরায় ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হন মাগুরার সোহান শাহ (২৬)। তিনি রামপুরার ভারগো গার্মেন্টসে এক্সিকিউটিভ মেইনটেইন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২৭ আগস্ট সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। একইভাবে ৫ আগস্ট ঢাকার সাভারে বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মাগুরার মারুফ বিশ্বাস মিঠু, যিনি আলাইপুর গ্রামের বাসিন্দা। ৫ আগস্ট ঢাকায় নিহত হন মো. আল আমিন হোসেন (৪২), বরুনাতলী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। তার বাবার নাম আবু আলেক বিশ্বাস।
সব হত্যার বিচারের দাবি জেলা ছাত্রদল ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারকাজে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। নিহতদের পরিবার ও সহপাঠীরা বলছেন, আজ যদি বিচার না হয়, কাল কার মৃত্যু হবে কেউ জানে না। এক বছরেও যদি খুনিদের ধরা না হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?