কুমিল্লায় আলোচিত ধর্ষণকাণ্ডে গ্রেপ্তার জিসান মিয়ার মামলা নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট মনির হোসেন পাটোয়ারী ও অ্যাডভোকেট সাইদুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করেছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব (জিপি-পিপি) মো. ফারুক হোসাইন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। তবে ওই চিঠিতে নিয়োগ বাতিলের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
চিঠির অনুলিপি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ও দায়রা জজ, পাবলিক প্রসিকিউটরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে আইন ও বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর জারি করা নিয়োগ সংক্রান্ত স্মারকের মাধ্যমে তাদের যে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল, নির্দেশিত হয়ে তাদের নিয়োগ সংক্রান্ত আদেশ বাতিল করা হলো।
একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি দেশব্যাপী আলোচিত ও ধর্ষণকাণ্ডে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়া ছাত্রশিবির নেতা জিসান মিয়ার পক্ষে গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়ে ছিলেন ওই দুই আইনজীবি। ওই বক্তব্যের কারণেই তাদেরকে এপিপির নিয়োগ বাতিল করা হয়।
এ বিষয়ে এপিপি অ্যাডভোকেট মনির হোসেন পাটোয়ারি বিকালে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘অধিকাংশ এপিপি নিজ আদালতের বাইরে আসামি পক্ষে সব ধরনের মামলা পরিচালনা করছেন, এর প্রমানও আছে। আমরা দুই এপিপি আসামির পক্ষে ওকালতনামায় স্বাক্ষর দিতে হয়নি। জিসানের পক্ষে তার ভাই অ্যাডভোকেট রাসেল আহমেদ ওকালত নামায় স্বাক্ষর করেছেন। আমরা শুধু আসামির পক্ষে আদালতের সামনে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেছিলাম। তবে এ কারণে আমাদের নিয়োগ বাতিল করা করা হয়েছে কিনা চিঠিতে তেমন কিছু উল্লেখ নেই।
এদিকে আদালত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে ‘সরকার নিযুক্ত একজন এপিপি কোন মামলার বিষয়ে সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে (মিডিয়া) এভাবে বক্তব্য রাখতে পারেন না। তাই কেউ হয়তো আইন মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি অবহিত করার পরই দুই জনের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত আসে।
কুমিল্লা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট কাইমুলহ হক রিংকু বলেন, আমরা পিপি এবং এপিপিরা কি করতে পারবো আর কি পারবো না, তা বিধিতে বলা আছে। সরকারের নিযুক্ত হয়ে এপিপিরা সরকারের বিরুদ্ধে কোন মামলায় বক্তব্য দেয়ার সুযোগ নেই। আমাদের এপিপি দুই সহকর্মীকে পদ থেকে প্রত্যাহারের চিঠি পেয়ে দুপুরে তাদের নিকট পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, এর আগে গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকালে জিসানকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩নং আমলী আদালতের বিচারক তৈয়ব উদ্দিনের আদালতে হাজির করা হয়। পরে তার জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেন বিচারক। এ সময় আদালত প্রাঙ্গনে আসামি পক্ষে এপিপি মনির হোসেন পাটোয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, ‘শুরু থেকেই পুলিশ মামলা নিয়ে লুকোচুরি খেলছে। মামলার শুনানী করতে আইনজীবীদের ওকালত নামায় স্বাক্ষর নেয়ার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ জিসানকে কারাগারে নিয়ে গেছে। ধর্ষণ মামলার অভিযোগ সঠিক নয়। আমরা আদালতে জিসানের সুচিকিৎসার আবেদন করেছি। অপর এপিপি সাইদুল ইসলামও অনুরুপ বক্তব্য দেন।
প্রসঙ্গত, গত ১১ জুন (বৃহস্পতিবার) রাতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও কুমিল্লা পশ্চিম অঞ্চলের সাবেক সভাপতি জিসান মিয়া প্রধান নিখোঁজ হন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। পরদিন এ বিষয়ে একটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয় দাউদকান্দি মডেল থানায়। ডায়েরি করার দিন রাত ৮টা-৯টার দিকে জেলার লাকসাম জংশন এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শনিবার (১৩ জুন) বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, ২৫ বছর বয়সী এক বিধবা নারী বাদি হয়ে ধর্ষণ ও ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় ওই নারী উল্লেখ করেন, গত ৫-৬ মাস আগে শিবির নেতা জিসানের সঙ্গে ওই নারীর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে দুইজন প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। গত ২০ মে শিবির নেতা জিসান তার দাউদকান্দির ভাড়া বাসায় নিয়ে ওই নারীকে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ করেন। পরে ওই নারী গর্ভবতী হয়ে পড়লে জিসান বাচ্চা নষ্ট করার জন্য চাপ দেন। জিসান তার চাচাতো ভাই সজীবকে দিয়ে বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ পাঠান। ওই নারীর রক্তক্ষরণ শুরু হলে তা পুনরায় সজীবকে জানান তিনি। জিসান সজীবকে দিয়ে পুনরায় ওষুধ পাঠান। পরে ওই নারী সুস্থ হয়ে উঠে জিসানকে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
শুক্রবার (১২ জুন) উভয়ের বিয়ের কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতে সেই বিয়ে থেকে বিরত থাকতেই নিখোঁজের নাটক সাজান শিবির নেতা জিসান। শনিবার (১৩ জুন) সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে জিসানকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন।
জহির শান্ত/এসএন