‘শহরটা আমরা গড়ি, কিন্তু শহরে আমাদের জন্য জায়গা নেই’ এমন আক্ষেপ শোনা গেল সাতক্ষীরার নিম্ন আয়ের মানুষের মুখে। কেউ রিকশা চালিয়ে, কেউ দিনমজুরি করে, কেউবা অন্যের ঘরে কাজ করে এই শহরটাকে সচল রাখছেন। অথচ তাদের মাথার ওপর নেই নিরাপদ ছাউনি। বৃষ্টি নামলেই ঘরে পানি ঢোকে, শীতে কাঁপতে হয়, আর গরমে টিনের ঘর আগুনের মতো জ্বলে ওঠে।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) সাতক্ষীরার ম্যানগ্রোভ সভাঘরে অনুষ্ঠিত নাগরিক সংলাপে উঠে আসে এ কষ্টের গল্প। সংলাপের বিষয় ছিল, ‘শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসনসংকট ও সমাধানে করণীয়’। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের আয়োজনে এ কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ কর্মী অধ্যক্ষ (অব.) আশেক এ এলাহী।
সংলাপে জানানো হয়, সাতক্ষীরা পৌরসভায় তালিকাভুক্ত বস্তি রয়েছে ৪৭টি। পৌরসভার জনসংখ্যা প্রায় ২ লাখ হলেও এর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বাস করে বস্তি ও ঝুপড়িতে। অর্থাৎ শহরের প্রতি চারজনের একজন বস্তিবাসী। যাদের বেশির ভাগই জলবায়ু উদ্বাস্তু। অথচ নগর উন্নয়নের কোনো পরিকল্পনায় তাদের অস্তিত্ব ধরা পড়ে না।
পৌরসভায় তালিকাভুক্ত এক বস্তির বাসিন্দা জবেদা বিবি কণ্ঠ ভারী করে বলেন, রাস্তার পাশে ঝুপড়ির মধ্যে আমার প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে থাকি। বৃষ্টি নামলে ভিজতে হয়। একই ভাবে গৃহকর্মী হাফিজা বেগমের অভিযোগ, সারা দিন অন্যের ঘরে রান্না করলেও নিজের ঘরে ফিরলে হাঁড়ি খালি পড়ে থাকে। ছেলেমেয়েদের স্কুলে দিতে পারি না, চিকিৎসাও করাতে পারি না।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জীবিকার সংকটে গ্রাম থেকে ছুটে আসা মানুষ শহরে আশ্রয় খোঁজেন। কিন্তু তারা এসে আটকা পড়ছেন অপরিকল্পিত ও অস্বাস্থ্যকর বস্তিতে, যেখানে নেই নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবা। ঋতু বদলালেই তাদের জীবনে নেমে আসে নতুন দুর্ভোগ।
সংবিধান, এসডিজির লক্ষ্য আর ওয়ার্ল্ড আরবান ফোরামের ঘোষণায় সবার জন্য সমান অধিকার ও নিরাপদ আবাসনের কথা থাকলেও বাস্তবে সেটা কার্যকর হচ্ছে না বলেও সংলাপে অভিযোগ ওঠে।
সংলাপে অংশ নেওয়া বক্তারা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব আবাসনের দাবি জানান। তারা বলেন, সরকারি সেবা-পরিষেবা বস্তিবাসীর নাগালে আনতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপণ্যের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সভায় বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক পবিত্র মোহন দাশ, সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শাহিনুল ইসলাম, মানবাধিকার কর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত, মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জ্যোৎসা দত্ত, ভূমিহীন নেতা আব্দুস সামাদ, নাগরিক নেতা আলী নুর খান বাবুল প্রমুখ।