বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির নামে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা অপচয় ও লুটের অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে। কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ করা বেশির ভাগ অর্থ তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া তথ্য এবং বিল-ভাউচার জমা দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নদী ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা। কাগজে কলমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
জানা যায়, ২০২০ সালে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার গাছের চারা রোপণের কথা থাকলেও বর্তমানে কোথাও চারার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ বিষয়ে জানতে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘ক্রসবারসহ কিছু কিছু জায়গায় ২০২০ সালে রোপণ করা চারার অস্তিত্ব থাকলেও অবশিষ্ট জায়গায় সেগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না।’
পরিবেশবাদী সংগঠনের দাবি, লোক দেখানো বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে এবং বৃক্ষরোপণের নামে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোডের কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা টাকা লুটপাট করেছেন। দুর্বল চারা ক্রয়, রোপণ করা গাছের চারার জন্য সার কেনা ও যত্ন করার কথা থাকলেও তার কিছুই করা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাওয়া প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের ৬৪টি জেলার জন্য নদী, খাল এবং জলাশয় পুনরুদ্ধার প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সিরাজগঞ্জ জেলার তিনটি উপজেলায় বৃক্ষরোপণের জন্য মোট ৩৭ লাখ ৮২ হাজার ৪৯১ টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল।
বরাদ্দ করা তহবিলের মধ্যে, সিরাজগঞ্জ শহরের কাটাখালী খালের উভয় পাড়ে প্রায় ২২ কিলোমিটার জায়গায় ৩ হাজার ৩০০টি গাছ লাগানোর জন্য চট্টগ্রামভিত্তিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনূস অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লিমিটেডকে তিনটি প্যাকেজে প্রায় ৮ লাখ ৯১ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় বিল সূর্য নদীর ২০ কিলোমিটার তীরে ৪৫১টি গাছ লাগানোর জন্য ঢাকার মিরপুরে তাজওয়ার ট্রেড সিস্টেমস লিমিটেড, চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি জয়েন্ট ভেঞ্চারকে (টিটিএসএল-সিএন্ডসি জেভি) ১ লাখ ২১ হাজার ৭৭৮ টাকা দেওয়া হয়।
বগুড়ার শেরপুরের টিটিএসএল-কেএসএ-এমআরএম জয়েন্ট ভেঞ্চারকে হুরাসাগর শাখা-১ এর ১০ কিলোমিটার তীরে ৪৫১টি গাছ লাগানোর জন্য ৮ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮১ টাকা এবং শাহজাদপুর উপজেলায় হুরাসাগর শাখা-২ এর সাড়ে ৫ কিলোমিটার তীরে ৭ হাজার ৪১৯টি গাছ লাগানোর জন্য ঢাকা ভিত্তিক আতাউর রহমান খান লিমিটেডকে ২ লাখ ৩৬৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
একইভাবে, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ (ওঅ্যান্ডএম) বিভাগের অধীনে সিরাজগঞ্জে ক্রসবার-১, ২, ৩, ৪ এবং হার্ড পয়েন্ট এলাকায় ৫ হাজার ৯৮০টি গাছ লাগানোর জন্য দুটি প্যাকেজে ১৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬২৩ টাকা ব্যয়ে কুষ্টিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘নির্মাতা কৌশলী’কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রকল্পের অধীনে বিআরই-এর বিভিন্ন স্থানে ৮৯৮টি গাছ লাগানোর জন্য সিরাজগঞ্জ সদরের পাঁচঠাকুরীর মেসার্স সালসাবিল এন্টারপ্রাইজকে ২ লাখ ২১ হাজার ৮৯০ টাকা দেওয়া হয়েছে। সরকার নতুন করে রোপণ করা গাছগুলোর যত্ন নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত তহবিল বরাদ্দ করেছে, যাতে কোনোভাবেই সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সিরাজগঞ্জ শহরের কাটাখালী খালের তীরে তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং আওয়ামী লীগ সরকারের প্রাক্তন মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি-২০২০ উদ্বোধন করেন। পরে সিরাজগঞ্জের সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ঠিকাদাররা প্রকল্পের আওতাধীন সব প্যাকেজের বিল তুলে নিলেও, প্রকল্পের আওতাধীন উল্লিখিত অনেক স্থানে গাছের চিহ্ন পর্যন্ত নেই।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল জনগণকে দেখানোর জন্য সিরাজগঞ্জ ক্রসবার-৩ এলাকায় কিছুসংখ্যক গাছের চারা রোপণ করেছিল। পরে তারা কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে সব টাকা তুলে নেন। সরজমিনে প্রকল্পস্থলগুলো পরিদর্শন করার সময় কিছু প্রকল্প এলাকায় কোনো গাছ বা চারা দেখা যায়নি।
লিটন সরকার নামে এক স্থানীয় যুবক বলেন, সেই সময়ে মানুষকে দেখানোর জন্য বড়পুল এলাকায় ও ক্রসবার এলাকায় কিছুসংখ্যক গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। তার কিছু মারা গেছে। আবার কিছু গাছ গরু ও ছাগল খেয়ে ফেলেছে বেড়া এবং যত্নের অভাবে।
সিরাজগঞ্জ স্বার্থ রক্ষা কমিটির সদস্য নবকুমার কর্মকার বলেন, ‘কখনো কখনো কিছু প্রকল্প প্রভাবশালী মহলের সুবিধাভোগের জন্য তৈরি করা হয়। সিরাজগঞ্জ শহরের বৃক্ষরোপণ প্রকল্পটিও এর মধ্যে একটি। ফলস্বরূপ, আমরা কোনো সুবিধা পাইনি। কেবল ঠিকাদারি সংস্থা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা প্রকল্পগুলো থেকে উপকৃত হয়েছেন। যদি গাছগুলো সঠিকভাবে রোপণ করা হতো এবং সেগুলো যত্ন নেওয়া হতো তাহলে সরকারি অর্থ অপচয় হতো না, সিরাজগঞ্জবাসীও উপকৃত হতো।
সিরাজগঞ্জে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘কিছু গাছ আছে, আবার কিছু গাছের চারা নষ্ট হয়েছে। গাছ রোপণের পর এক বছরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আমাদের কাছে সামান্য পরিমাণ তহবিল দেওয়া হয়। সেটা অনেক আগেই শেষ হয়েছে। যে সময় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই সময় আমি সিরাজগঞ্জের দায়িত্বে ছিলাম না।’