চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ঘরের ছাদের উপর দিয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হাই-ভোল্টেজ বৈদ্যুতিক তার সরাতে দেড় লাখ টাকা দাবি করেছে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ, এমনই এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। অথচ সাত বছর আগে থেকেই ভুক্তভোগীরা বারবার লিখিত ও মৌখিকভাবে আবেদন জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। সেই অবহেলার মাশুল গুনতে হলো তরুণী আসমা আক্তারকে।
রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) দুই সন্তানের জননী আসমা (২৫) বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আনোয়ারা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এ ধরনের অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইন রয়েছে। বারবার অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। বরং অভিযোগকারীদের থেকে লাইন সরানোর নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ দাবি করেছে।
নিহতের শ্বশুর মাষ্টার আশরাফ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “২০১৮ সালে প্রথম লিখিত অভিযোগ করেছিলাম। এরপর বহুবার জানিয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বরং একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়েছিল, লাইন সরাতে আমাদের ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা দিতে হবে। অথচ সরকারি খরচ বাবদ আমি ১৭শ টাকা জমা দিয়েছিলাম। এই মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা বিদ্যুৎ বিভাগের অবহেলা ও দুর্নীতির নির্মম পরিণতি।”
আসমার স্বামী মো. তারেক বলেন, “আমার দুই শিশু এখন মা হারা। আমি কোথায় যাবো তাদের নিয়ে? বিদ্যুৎ বিভাগের যারা অবহেলা করেছে, যারা টাকা দাবি করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এই মৃত্যুর দায় তারা এড়াতে পারে না।”
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ওই এলাকার মানুষ বারবার বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে লিখিত-মৌখিক অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কখনো প্রতিনিধি পাঠানো হয়নি। উল্টো টাকা ছাড়া কোনো কাজ করা যাবে না বলে জানানো হয়েছে। এমনকি আসমার মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও ঘটনাস্থলে পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত হননি।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সেলিম বলেন, “২০১৮ সাল থেকে আমরা বারবার বলেছি আশপাশের ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো সরাতে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। আশপাশের বহু জায়গায় কভারবিহীন, ঝুলন্ত উচ্চভোল্টেজ লাইন ঝুঁকি তৈরি করছে। আমরা যেনো প্রতিদিন মৃত্যুর সাথে বসবাস করছি।”
অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ারা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. মোরশেদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। বরং বিষয়টিকে ভিন্ন প্রসঙ্গে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তিনি বলেন, “আমি যা বলার বলে দিয়েছি। এ বিষয়ে আর কিছু বলবো না। ওনাদের (নিহতের পরিবারকে) কে যে ডিমান্ড দেওয়া হয়েছে, সেটা পূরণ করতে বলুন।”
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমি বিষয়টি অবগত আছি। শুধু এই নয়—উপজেলার যে-সব স্থানে ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগ রয়েছে, তা অপসারণে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশনা দেওয়া হবে।”
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগে রায়পুর ইউনিয়নে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান মনির হোসেন নামের এক কিশোর। পরৈকোড়া ইউনিয়নে গোয়াল ঘরে কাজ করতে গিয়ে হাই-ভোল্টেজ তারে জড়িয়ে প্রাণ হারান কলেজ শিক্ষার্থী মাসুদুল হাসান রানা (২৪)। প্রতিটি ঘটনায় অভিযোগ উঠলেও বিদ্যুৎ বিভাগ আজও জবাবদিহির আওতায় আসেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আনোয়ারা বিদ্যুৎ অফিস দুর্নীতি, অদক্ষতা ও অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত মানুষকে জীবন ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, অনিয়মিত বিদ্যুৎ বিল তৈরি, গ্রাহকের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, এমনকি কাজ করিয়ে নেওয়ার জন্য ঘুষ দাবি করার অভিযোগও বহুল প্রচলিত।
একজন তরুণী গৃহবধূ, দুই সন্তানের মায়ের মৃত্যু কি তবে টাকার কাছে হার মানল? মানুষের জীবনের মূল্য কি বিদ্যুৎ অফিসের অনিয়মের কাছে কেবল নগণ্য? স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, কত প্রাণহানি হলে বিদ্যুৎ বিভাগ জবাবদিহি করবে?
প্রাণ দিলেন তরুণী আসমা আক্তার। আর রেখে গেলেন শোকার্ত পরিবার, অসহায় স্বামী আর মা-বিহীন দুই শিশুকে।
আতিকুল/নাঈম