তখন দুপুর ১টা। দিয়াবাড়ীর সেই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণ। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে যেতেই চোখে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবনটি। এখনো টিনের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভবনের সামনে সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে চোখে পড়ে নতুন রোপণ করা বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বাতাসে সেগুলো দুলছিল। কাছে গিয়ে দেখা যায়, গাছের গোড়ায় রয়েছে একটি নামফলক। সেখানে লেখা রয়েছে- বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শহিদ স্মরণে বৃক্ষরোপণ- মাহিয়া তাসনিম মায়া- মাইলস্টোন স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পথটির ধার ঘেঁষে কিছু দূর পরপর রোপণ করা হয়েছে আরও অনেক গাছ। প্রতিটি গাছের সঙ্গে নিহতদের আলাদা নামফলক থাকতে দেখা গেছে। নিহতরা যেন এখনো জীবিত হয়ে আছে ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে।
যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার শতদিন (১০১ দিন) পর গতকাল বৃহস্পতিবার ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে এমন দৃশ্য দেখা যায়। গত ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সেই মর্মান্তিক ঘটনায় বিমানের পাইলটসহ ৩৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন অভিভাবক, তিনজন শিক্ষক এবং একজন স্টাফ।
মাইলস্টোনের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. তরিকুল ইসলাম বলে, ‘গাছগুলো লাগানোর কারণে মনে হচ্ছে তারা আমাদের মধ্যে রয়েছে। আমরাও তাদের ভুলতে চাই না।’
মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ বলছে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের হারিয়ে আমরা ক্ষতির শিকার হয়েছি, তা অপূরণীয়। এই শোক মাইলস্টোন কোনো দিনও কাটিয়ে উঠতে পারবে না। তারা আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাদের স্মরণে ক্যাম্পাসজুড়ে বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। নিহত প্রত্যেক শহিদকে সব সময় আমাদের স্মরণে রাখতে চাই। এ জন্যই প্রত্যেক শহিদের নামফলকসহ আলাদা আলাদা বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।
বৃক্ষরোপণ করা ছাড়াও নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্য (ভাই-বোন) এবং আহত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা সম্পূর্ণ খরচ ফ্রি করে দিয়েছে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ। তবে ঘটনার এতদিনেও নিহত-আহতের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি। এই নিয়ে হতাহতদের পরিবারের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এদিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অক্ষম আহতদের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে তাদের পরিবার।
হতাহতদের অভিভাবকরা বলছেন, দুর্ঘটনার এতগুলো দিন কেটে গেল। দুর্ঘটনার পর প্রথম দিকে কিছু খোঁজখবর মিললেও বর্তমানে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ ছাড়া আর কেউ পাশে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এখন কোনো খবর নেওয়া হয় না। সরকার নিহত-আহতদের কাউকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) শাহ বুলবুল খবরের কাগজকে বলেন, মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখনো সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।
ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে দেখা যায়, প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবনটি একইভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভবনটিতে এখনো নীরবতা বিরাজ করছে। টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভবনটির সামনে রাস্তার পাশে বিশাল মাঠ। প্রশাসনিক ভবনের সামনে রোপণ একটি গাছের গোড়ায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মাসুকা বেগম এবং ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর মাহফুজা খাতুনের নামফলক। এর পাশের একটি গাছের গোড়ায় রয়েছে মাইলস্টোনের স্টাফ মাসুমা বেগমের নামফলক।
সম্প্রতি জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট থেকে মোহাম্মদ নাভিদ নেওয়াজ (১২) নামে এক শিক্ষার্থীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে ৩১ জন ছাড়পত্র নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষার্থী জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ফারহানা শারমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাইলস্টোনে দুর্ঘটনার পর থেকে গত ২৩ জুলাই থেকে ৩১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪৩২ জনকে কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৬৫ জন শিক্ষার্থী, ২৬ জন শিক্ষক, ১৩ জন আয়া-পিয়ন এবং ২৮ জন অভিভাবক। ৪৩২ জনই বারবার কাউন্সেলিং নিয়েছেন। এখন শিক্ষার্থীরা ট্রমা কাটিয়ে উঠেছে। কাউন্সেলিং লাগছে না। তবে আহত যারা হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাচ্ছেন, তাদের তিনজনকে হোম কাউন্সেলিং দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়া পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুপী বড়ুয়ার অভিভাবক হোম কাউন্সেলিং সেবা চেয়েছেন। আমরা তাকে হোম কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া শুরু করব।’