প্রায় পাঁচ দশক ধরে মানুষকে গান শুনিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হেলাল মিয়া (৬৫)। তার কণ্ঠে মারফতি, মুর্শিদী ও কাওয়ালীর মতো আধ্যাত্মিক গানগুলো উজ্জীবিত করে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে। শুধু হেলালই নন, তার পরিবারের আরও আট সদস্য জন্ম থেকেই অন্ধ। গান গেয়েই সংসার চলে অন্ধ হেলালের। তবে ‘মাদরাসাছাত্রের বাধায়’ গত ছয়দিন ধরে গান গাইতে পারছেন না তিনি। ফলে বন্ধ রয়েছে রোজগারও। বর্তমানে ধার-দেনা করে চলছে বলে জানিয়েছেন হেলাল মিয়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নাটাই উত্তর ইউনিয়নের রাজঘর গ্রামের বাসিন্দা হেলাল মিয়া জন্ম থেকেই অন্ধ। তিনি ছাড়াও তার চার ছেলে ও এক মেয়ে এবং দুই নাতি ও এক নাতনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলেও ভিক্ষাবৃত্তি না করে বরং মানুষকে গান শুনিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত জেলা শহরের পৌর মুক্তমঞ্চ মাঠে গানের আসর জমান হেলাল ও তার পাঁচ ছেলে-মেয়ে। তাদের কণ্ঠে গানের সুর উঠতেই জমে ওঠে আসর। যোগ দেন নানা বয়সী মানুষ। এভাবেই প্রতিদিন হেলাল ও তার সন্তানদের গান শুনে খুশি হয়ে টাকা দেন মানুষজন। আর সেই টাকা দিয়ে জীবন চলছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী পরিবারটির। তবে গত বুধবার (২৬ নভেম্বর) দুপুরে কয়েকজন মাদরাসাছাত্র মুক্তমঞ্চ মাঠে গিয়ে হেলাল মিয়াকে গান- বাজনা বন্ধ করতে বলেন।
তবে হেলাল মিয়া অভিযোগ করেন, 'বুধবার সকালে কয়েকজন মাদরাসাছাত্র এসে গান-বাজনা বন্ধ করে ভিক্ষাবৃত্তি করতে বলেন। অন্যথায় বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর করবেন বলে হুমকি দেন। হুমকির পর থেকে আর গান করছেন না বলে জানান তিনি।'
তিনি বলেন, 'গত ছয়দিন ধরে গান বন্ধ, সঙ্গে আমাদের রোজগারও। চলতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। কারণ আমরা দিন এনে দিন খাই। হাতে কিছু টাকা ছিল, আর কিছু ঋণ করেছি। এভাবেই চলছি এখন। ভয়ে আর গান গাইতে যাচ্ছি না। বিষয়টি কচি ভাইকে (সাবেক সভাপতি, জেলা বিএনপি) জানিয়েছিলাম। তিনি আগামীকাল (মঙ্গলবার) থেকে আবার গান গাইতে যাওয়ার জন্য বলেছেন। কিন্তু এখনও ভয়ে আছি গেলে যদি আবার কোনো বিপদ হয়। কারণ এর আগেও কয়েক মাস আগে আরও দুই দফায় গান-বাজনা বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি জানান, অতীতে তিনি হেলাল মিয়ার পরিবারকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাদের গানে বাধা দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। হেলাল মিয়া যেন আবার গান গাইতে পারেন- সেজন্য তাদেরকে মুক্তমঞ্চ মাঠে বসতে বলেছেন বলে জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মুফতি মুবারক উল্লাহ বলেন, 'আমাদের ছেলেরা (মাদরাসাছাত্র) বাধা দিয়েছে- এটি আমি জানি না। আমাদের কোনো বাধা-নিষেধ নেই। তবে আমরা অনুমতি দিতে পারি না। যে গানই হোক; গান যেহেতু শরীয়তে নিষিদ্ধ। তাদের পথে তারা চলুক। তাদেরকে বাধা দেয়নি কেউ।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী পরিবারকে গান গাইতে বাধা দেওয়ার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। এ বিষয়ে কেউ আমাদের কাছে অভিযোগও করেনি।
সঞ্চয়/মেহেদী/