আম উৎপাদনের জন্য ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি অর্থবছরে আমবাগানের জমি কমে গেছে। অন্যদিকে নওগাঁয় বাগানের পরিমাণ সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অনিয়ন্ত্রিত পুকুর খনন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক চাষি আম থেকে সরে গিয়ে মাছচাষে ঝুঁকছেন। এতে বদলে যাচ্ছে এ অঞ্চলের কৃষিভূমির ব্যবহার ও অর্থনৈতিক চরিত্র।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজশাহীতে আমবাগানের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৬০৩ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টরে। বর্তমানে জেলায় প্রায় ৩৭ লাখ আমগাছ রয়েছে, যার ৬০ শতাংশে ইতোমধ্যে মুকুল এসেছে।
এদিকে, ‘আমের রাজধানী’ চাঁপাইনবাবগঞ্জেও বাগানের পরিমাণ কমেছে। গত অর্থবছরের ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর থেকে চলতি অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টরে। তবে জেলায় ৯২ লাখ ৪০ হাজার আমগাছের প্রায় ৭০ শতাংশে মুকুল দেখা গেছে।
কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমবাগান কমার প্রধান কারণ অনিয়ন্ত্রিত পুকুর খনন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পোকামাকড় ও রোগবালাই বেড়েছে, উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি আমের ন্যায্য দাম না পাওয়ার শঙ্কা ও মাছচাষে তুলনামূলক বেশি লাভের সম্ভাবনা কৃষকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজশাহী জেলায় নিট আবাদি জমি কমেছে ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টরে। অর্থাৎ চাষযোগ্য জমির একটি অংশ পুকুর ও জলাশয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আমচাষি শহিদুল হোসেন বলেন, ‘এক দশক আগে বাগানে বছরে একবার সার ও কীটনাশক দিলেই চলত। এখন পোকামাকড় ও রোগবালাই অনেক বেড়েছে। স্প্রে দ্বিগুণ করতে হচ্ছে। খরচ বাড়ছে, কিন্তু আম বিক্রির আয় সে হারে বাড়ছে না।’
এ ছাড়া অতিরিক্ত হরমোন ব্যবহারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত ও বেশি ফলনের আশায় মাত্রাতিরিক্ত হরমোন প্রয়োগ করায় বড় ও পুরোনো আমগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে উজাড় হচ্ছে বড় বড় বাগানগুলো। ফলে আমবাগান কেটে বিকল্প চাষাবাদের চেষ্টা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাছচাষি জানান, প্রচলিত ধান বা আমচাষের তুলনায় মাছচাষে ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি লাভের সম্ভাবনা থাকে। ঝুঁকি কম, নগদ আয় দ্রুত আসে–তাই অনেকেই পুকুর খননে আগ্রহী হচ্ছেন।
তবে নওগাঁয় চিত্র ভিন্ন। সেখানে গত বছরের ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টর থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমবাগানের পরিমাণ হয়েছে ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নওগাঁয় পুকুর খনন তুলনামূলক কম এবং আগাম জাতের আমচাষ লাভজনক হওয়ায় মালিকরা বাগান ধরে রাখছেন। বাজারে আগাম আমের চাহিদা ও ভালো দাম পাওয়াও এতে ভূমিকা রাখছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাগান ও আবাদি জমি পুকুর ও অবকাঠামোতে রূপান্তরিত হলে রাজশাহী অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ও আমকেন্দ্রিক দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে মৌসুমি কর্মসংস্থানও হুমকির মুখে পড়বে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোনোমি ও অ্যাগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ধানখেত ও আমবাগানকে মাছের ঘেরে রূপান্তরের প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে আয় বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির ঝুঁকি রয়েছে। কেননা, অতিরিক্ত পুকুর খনন মাটির গঠন ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা বদলে দিতে পারে। ভবিষ্যতে সেই জমিকে আবার বাগান বা ফসলি জমিতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এতে মাটির প্রাকৃতিক পুষ্টি পুনর্ব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং উর্বর জমির স্থায়ী পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।’