রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে সিল করা সয়াবিন তেলের বোতলের ভেতরে মাছি পাওয়ার ঘটনায় এবার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ক্রেতা শাহরিয়ার সায়েম।
বুধবার (৬ মে) জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, রাজশাহী জেলা কার্যালয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
এদিকে, ঘটনাটি ইতোমধ্যে রাজশাহীজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং ভোক্তাদের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার পারিলা বাজারের একটি মুদি দোকান থেকে দুই লিটারের ফুডেলা ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেলের একটি সিল করা বোতল কেনেন সায়েম। বাড়িতে নিয়ে ব্যবহারের প্রস্তুতিকালে তার পরিবারের সদস্যরা বোতলের ভেতরে একটি মৃত মাছি দেখতে পান। পরে বিষয়টি প্রমাণ হিসেবে বোতলটি অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয় এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী শাহরিয়ার সায়েম বলেন, “সিল করা একটি খাদ্যপণ্যের ভেতরে এভাবে মাছি পাওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বিষয়টি মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি বলেই ভোক্তা অধিকার কার্যালয়ে অভিযোগ করেছি। আমি চাই, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।”
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার সহকারী পরিচালক বিপুল বিশ্বাস জানান, অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রাথমিক যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “অভিযোগকারীর সংরক্ষিত বোতলটি পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি একই দোকান ও বাজার থেকে সংশ্লিষ্ট পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হবে। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান—উভয় পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হবে। সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, তদন্তের অংশ হিসেবে বিক্রেতা, ডিলার এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এদিকে রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিল করা বোতলের ভেতরে মাছি পাওয়া যাওয়া খাদ্য দূষণের একটি গুরুতর লক্ষণ।
রাজশাহী সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আব্দুল হান্নান বলেন, সিল করা বোতলে মাছি পাওয়া স্পষ্ট দূষণের প্রমাণ এবং এতে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকে। তবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে স্যাম্পলিং ও ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য সংশ্লিষ্ট বোতল সংরক্ষণ ও একই লটের আরও নমুনা পরীক্ষা করা জরুরি। তিনি জানান, প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া, জনস্বার্থে ওই লটের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার ও বিক্রি বন্ধ করা উচিত।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষায় গুণগত মানে ত্রুটি বা মানদণ্ড লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএসটিআই রাজশাহী বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. আজিজুল হাকিম বলেন, সয়াবিন তেল একটি মান নিয়ন্ত্রিত পণ্য এবং বাজারজাতের আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সার্টিফিকেশন নেওয়া হয়। তবে সিল করা বোতলে মাছি পাওয়ার ঘটনা দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে এবং ত্রুটি প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি হেড অব মার্কেটিং মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ফুডেলা সয়াবিন তেল আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে উৎপাদন ও বোতলজাত করা হয়, যেখানে এ ধরনের দূষণের সুযোগ নেই। তবে সিল করা বোতলে মাছি পাওয়ার ঘটনাটি অস্বাভাবিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যাচে ত্রুটি প্রমাণিত হলে সেই পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করা হবে।
এনায়েত করিম/এসএন