ফেনীর আকাশে তখন বিকেলের নরম আলো। কিন্তু সেই আলো ছাপিয়ে শহরজুড়ে নেমে আসে এক গভীর শোকের আবহ। একসঙ্গে বেজে ওঠা অন্তত ২৫টি অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—আজ বিদায় নিচ্ছেন এমন একজন, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অন্যের জীবন বাঁচাতেই ছুটে বেড়িয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত অ্যাম্বুলেন্স চালক নুর আলম ও তার ছেলে নুর হাসনাত নিরবের শেষযাত্রায় সহকর্মীদের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা ছুঁয়ে গেল পুরো জনপদকে।
মঙ্গলবার (১২ মে) বিকেলে ফেনীর মিজান ময়দানে জানাজা শেষে নুর আলম ও তার ছেলের মরদেহ পৃথক দুটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এরপর অন্তত ২৫টি অ্যাম্বুলেন্সের একটি দীর্ঘ শোকবহর সাইরেন বাজিয়ে সোনাগাজী উপজেলার রাজাপুর গ্রামর উদ্দেশে রওনা দেয়।
যে মানুষটি বছরের পর বছর অসুস্থ, দুর্ঘটনাকবলিত ও বিপদে পড়া মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিতে ছুটে বেড়িয়েছেন, শেষ বিদায়ে তাকেই বহন করলো সহকর্মীদের দীর্ঘ অ্যাম্বুলেন্স বহর। সাইরেনের শব্দে শহরের ব্যস্ত সড়কগুলো যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায়। পথচারীরা থেমে দাঁড়ান, কেউ কেউ নীরবে তাকিয়ে থাকেন—একজন মানুষের প্রতি সহকর্মীদের এই গভীর ভালোবাসা প্রত্যক্ষ করতে।
ফেনী জেলা অ্যাম্বুলেন্স মালিক-চালক কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, নুর আলম শুধু একজন চালক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন মানবিক মানুষ, যিনি যেকোনো বিপদে সবার আগে এগিয়ে যেতেন। তাই তার শেষযাত্রায় সহকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন।
সহকর্মী চালক মোহাম্মদ বেলাল হোসেন বলেন, প্রতিদিন তারা মানুষের জীবন বাঁচাতে ছুটে চলেন। কিন্তু নিজেদের একজনকে এভাবে বিদায় জানাতে হবে, তা কখনো ভাবেননি। সাইরেন বাজানোর সময় বারবার চোখ ভিজে উঠছিল তার।
আরেক চালক জামাল উদ্দিন জানান, নুর আলম ছিলেন সবার প্রিয়। কোনো সহকর্মী সমস্যায় পড়লে তিনি সবার আগে পাশে দাঁড়াতেন। তাই তার শেষ বিদায়ে কেউ ডাকা ছাড়াই সবাই নিজ দায়িত্বে এসে শামিল হয়েছেন।
সন্ধ্যার দিকে বহরটি রাজাপুর গ্রামে পৌঁছালে সেখানে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। স্বজনদের আহাজারি, প্রতিবেশীদের কান্না আর হাজারো মানুষের ভিড়ে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। একনজর শেষবারের মতো দেখার জন্য বাড়ির সামনে মানুষের ঢল নামে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসঙ্গে এত অ্যাম্বুলেন্সের শোকবহর তারা আগে কখনো দেখেননি। সাইরেনের শব্দে মনে হচ্ছিল পুরো গ্রাম যেন শোকে নীরব হয়ে গেছে। একজন সাধারণ মানুষের প্রতি সহকর্মীদের এমন সম্মান ও ভালোবাসা সত্যিই বিরল—এ দৃশ্য অনেককেই চোখের পানি আটকে রাখতে দেয়নি।
পরে দ্বিতীয় জানাযা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে বাবা-ছেলেকে দাফন করা হয়।
এর আগে মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার হাফেজিয়া এলাকায় দ্রুতগতির একটি বাস মোটরসাইকেলকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন নুর আলম। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান তার ছেলে নুর হাসনাত নিরব। এ ঘটনায় আহত হন তার ভাগিনা আফজাল মিঠু।
এসএন/