রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হলেও এখন পর্যন্ত তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। বিচার পাওয়া নিয়ে গভীর শঙ্কায় রয়েছেন নিহত ও আহতদের স্বজনরা।
গত ২৫ মার্চ বিকেল সোয়া ৫টার দিকে কুমারখালি থেকে ছেড়ে আসা সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি (রেজি. নং: রাজবাড়ী ব-১১-০০২৪) দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে সংযোগ সড়ক থেকে পন্টুনে নামার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২৬ জন যাত্রী। দুর্ঘটনায় বাসের চালকও নিহত হন। ঘটনার দিন রাতেই তার মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ২৬ মার্চ সকালে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলার বাদী ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা থানার খন্দকবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ফিজিওথেরাপিস্ট মো. নুরুজ্জামান। ঈদের ছুটি কাটিয়ে সেদিন পরিবার নিয়ে ঢাকা ফিরছিলেন তিনি। দুপুর আড়াইটার দিকে কুমারখালি বাস টার্মিনাল থেকে এফ-১, এফ-২ সিটের টিকেট কেটে স্ত্রী আয়শা আক্তার সোমা (৩০), তিন বছরের মেয়ে নুরে জান্নাত নাওয়ার এবং মাত্র সাত মাস বয়সি শিশুপুত্র নাজিফ বিন জামান আরশানকে নিয়ে বাসে ওঠেন।
দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর পর ফেরির অপেক্ষায় পন্টুনের কাছে বাস থামে। কিছুক্ষণ পর নুরুজ্জামান মেয়েকে নিয়ে বাস থেকে নেমে পন্টুনে চলে যান। বাসেই রয়ে যান স্ত্রী ও শিশুপুত্র। হঠাৎ বিকট শব্দে পেছন ফিরে তাকিয়ে তিনি দেখেন, বাসটি দ্রুতগতিতে এগিয়ে পন্টুনের শেষ প্রান্তে ধাক্কা মেরে নদীতে উল্টে পড়ছে। চিৎকার করে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করেন তিনি।
ঘটনার পরপরই নৌ পুলিশ ও স্থানীয়রা ৬-৭ জন আহত যাত্রীকে পানি থেকে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা প্রায় ছয় ঘণ্টা চেষ্টা করে বাসটি নদী থেকে তোলে। বাসের ভেতর থেকে ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল উদ্ধার করে নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়শা আক্তার সোমা ও সাত মাসের শিশুপুত্র নাজিফসহ মোট ২৬ জনের নিথর দেহ।
দুর্ঘটনার পর গত ৪ এপ্রিল নুরুজ্জামান বাদী হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট থানায় বাসের অজ্ঞাতনামা চালক, হেলপার, সুপারভাইজারসহ বাস পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪/১০৯/২৭৯ ধারায় মামলা দায়ের করেন।
এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, বাসের চালক ও সংশ্লিষ্টরা যাত্রীদের মৃত্যুর ঝুঁকির কথা জেনেও কোনো সতর্কতা না দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাস দাঁড় করিয়ে রাখেন এবং পরে বেপরোয়াভাবে বাস চালিয়ে পন্টুনে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেন।
গোয়ালন্দ ঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সফিকুল ইসলাম বলেন, "মামলা হওয়ার পর তদন্তের দায়িত্ব নৌ পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। তারা তদন্ত শেষ করে আদালতে রিপোর্ট দেবে। এ বিষয়ে আমরা আর কিছু বলতে পারব না।"
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দৌলতদিয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ত্রিনাথ সাহা বলেন, "মামলার তদন্ত কাজ এখনও শেষ হয়নি। তদন্ত শেষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তদন্তেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। এতে বিচার পাওয়া নিয়ে গভীর হতাশা ও শঙ্কায় পড়েছেন নিহতদের পরিবার।
সচেতন মহল দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা এবং চালকদের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সুমন বিশ্বাস/এসএম