বর্ষা মৌসুম এলেই কক্সবাজারের টেকনাফে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। প্রতিবছরের মতো এবারও একটু ভারী বৃষ্টিপাতেই উপজেলার অধিকাংশ গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, বীজতলা ও মৎস্য ঘের। ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে কৃষক ও খামারিদের। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, খাল ভরাট ও অবৈধ দখলের কারণেই পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে উপজেলার চিহ্নিত ৪০টি খাল পুনর্খননের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলা কৃষি ও মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে টেকনাফ উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমির আউশ বীজতলা, ধানখেত, সবজি চাষ ও পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে প্রায় ১০৭ হেক্টর জমির ফসল আংশিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে। অন্যদিকে চিংড়ি ঘের ও পুকুরসহ প্রায় ৮০০ হেক্টর মৎস্য খামারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, এসব মৎস্য খামারে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। টানা বৃষ্টিপাতের প্রভাবে শুধু মাছের ঘের ও পুকুরই নয়, ক্ষতির মুখে পড়েছে বিভিন্ন পোলট্রি খামার। ফলে কৃষক ও খামারিরা আর্থিকভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জানান, খাল ভরাট ও দখলের কারণে প্রতিবছর টানা ভারী বৃষ্টিপাতে তার ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। সীমান্ত সড়কের স্লুইচ গেটের সংখ্যা বাড়ানো হলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে বলে মত দেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট, দখল ও নিয়মিত খননের অভাবে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে না পারায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। উপজেলার সব খাল খনন, সংস্কার ও অবৈধ দখলমুক্ত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে তারা।
টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিহাদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি একটি সময়োপযোগী ও কৃষিবান্ধব উদ্যোগ। টেকনাফ উপজেলায় খাল খননের জন্য ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় তালিকা পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান হবে ও এলাকার মানুষ স্বস্তি ফিরে পাবেন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সরকারের খাল খনন ও পুনর্খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে টেকনাফের সাবরাং, বাহারছড়া, হ্নীলা, টেকনাফ সদর ও পৌরসভা এলাকার মোট ৪০টি খালের বর্তমান অবস্থা, দৈর্ঘ্য, আয়তন, বিএস (বাংলাদেশ সার্ভে) ও দিয়ারা দাগ নম্বরসহ তালিকা এবং প্রয়োজনীয় হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এগুলোকে পুনর্খনন কার্যক্রমের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খাল দখল প্রসঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. রফিক বলেন, টেকনাফ পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কায়ুকখালী খালটি আগের ম্যাপ ও আরএস দাগ অনুযায়ী পুনরুদ্ধার করতে হবে। খালের দুই পাশ থেকে সব ধরনের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মোহাম্মদ অনীক চৌধুরী বলেন, টেকনাফ পৌরসভার প্রাণকেন্দ্র ও প্রধান পানি নিষ্কাশন পথ হিসেবে পরিচিত কায়ুকখালী খাল পুনর্খননের কাজ খুব শিগগির শুরু হবে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস (ডিআরআর) ম্যাপ অনুযায়ী খাল খনন ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আগের ম্যাপ অনুসারে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হলে অনেকের মালিকানাধীন জমি খালের আওতায় পড়তে পারে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, পৌর এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বড় খাল ও হেচ্চ্যা খালের সংস্কার কাজও দ্রুত শুরু করা হবে।
ইউএনও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভিত্তিক খাল খনন কর্মসূচির আওতায় পর্যায়ক্রমে টেকনাফের ৪০টি খাল দখলমুক্ত করে পুনর্খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের জন্য খালের তালিকা ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জলাবদ্ধতা নিরসন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।