বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে আছেন রহমান সাহেব। হাতে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা। দক্ষিণের এই বারান্দাটা ওনার বড্ড প্রিয়। বারান্দা থেকেই বধ্যভূমিটা চোখে পড়ে কি না।
রহমান সাহেবের নাতি নিহান। বয়স মাত্র ৫ বছর। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরেই সোজা দাদুর রুমে চলে আসে সে।
- দাদু আগামীকাল স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে আমার স্কুলে গল্প বলা প্রতিযোগিতা হবে। তুমি তো কিশোর মুক্তিযোদ্ধা। আমি তোমার যুদ্ধদিনের কাহিনি সবাইকে শোনাব।
সেই দিনগুলোর কথা মনে হতেই রহমান সাহেবের চোখে পানি আসে। ডাক্তার দেখাতে হবে মনে হচ্ছে। নিহান চুপচাপ মোড়ায় বসে দাদুর দিকে তাকিয়ে থাকে। রহমান সাহেব শুরু করেন। বুঝলে দাদু ভাই, তখন আমি ১৫ বছরের কিশোর। দেশের অবস্থা খুব খারাপ। স্কুল-কলেজ সব বন্ধ হয়ে গেল। আমার বন্ধুরা সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল। কেউ গেল নানুবাড়ি, কেউ দাদুবাড়ি কেউবা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত। আমি খুব একা হয়ে গেলাম। সারাদিন বাড়ির আশপাশেই ঘুরতে থাকি।
এ করেই দিন কাটতে লাগল। মার্চ মাসের শেষদিকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলো। প্রতিদিন সন্ধ্যারাতেই দেখতাম বাবা, ছোট চাচা আর স্কুলের পলাশ স্যার বাড়ির কাছারি ঘরটায় কী যেন ফিসফাস করতেন। মা ওনাদের জন্য চা বানিয়ে আমাকে দিয়ে পাঠাতেন। চা নিয়ে গেলেই ওনারা চুপ হয়ে যেতেন। আমার সেই কিশোর মনে চাপা আগ্রহ। যদিও জানতাম, ঠিক হচ্ছে না, তার পরও কতবার যে আড়ি পাতার চেষ্টা করেছি ওনাদের কথা শুনতে। কিছুই শুনতে পারিনি। বাবা আর ছোট চাচ্চুকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই দিতেন ধমক।
শেষে একদিন থাকতে না পেরে পলাশ স্যারকেই ধরলাম, যিনি আমার খুব প্রিয় ছিলেন। স্যার আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারলেন। ওনার কথা শুনে খুব অবাক হলাম। কী সাংঘাতিক কথা! সবাই তলে তলে তৈরি হচ্ছেন যুদ্ধে যাওয়ার! এসব নিয়েই চলছে নানা ধরনের পরিকল্পনা।
সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। স্যারকে বললাম, আমিও দেশের জন্য কিছু করতে চাই।
স্যার বললেন, তুই তো অনেক ছোটরে।
উত্তরে বললাম, স্যার, দেশের জন্য কিছু করার অধিকার কি আমার নেই?
স্যারের চোখে পানি। বললেন, আজ মাগরিবের পর বাড়িতে আয়।
অবশেষে সন্ধ্যায় স্যারের বাড়িতে এলাম। স্যার শুধু বললেন, মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে তোকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
বুঝলাম বড়দের মিটিংয়ে আমার প্রবেশাধিকার নেই। তবে আমি খুশি, দায়িত্ব একটা কিছু তো পেয়েছি! তা যতই ছোট হোক না কেন।
গ্রামের শেষে একটা ফল-ফলাদির বাগিচা আছে। এমনিতে আমার খুব প্রিয় জায়গা ওটা। গ্রীষ্মকালে আম-কাঁঠাল আর শীতকালে পাকা কুল; আহা কোন ফলটা ছিল না ওই বাগিচায়! মাঝের ফাঁকা অংশে মাটিতে লাটিম ঘোরাতাম।
যাই হোক, আমার কাজ ছিল বাগিচার উত্তর দিকে ঠায় দাঁড়ানো বটগাছটার কোটরে খাবার রেখে আসা। কিছু মুক্তিসেনার জন্য এ আয়োজন; যাতে তারা গ্রামে না ঢুকেও খাবার পেতে পারেন।
এভাবেই আমি সবার চোখ এড়িয়ে কাজ করে যাচ্ছিলাম। ছোট বলে কেউ সন্দেহ করত না। তবে একদিন সত্যি সত্যি বিপদে পড়ে গেলাম। তিনজন ইয়া লম্বা পাকসেনার হাতে ধরা পড়লাম।
ওরা জিজ্ঞেস করল, খাবার কোথায় নেওয়া হচ্ছে? কার জন্য নেওয়া হচ্ছে?
প্রথমে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরক্ষণেই সামলে নিলাম। এ ঘোর বিপদে মাথা ঠাণ্ডা রাখা চাই। ইশারা- ইঙ্গিতে বললাম, এ খাবার পাশের মসজিদের ইমাম সাহেবের জন্য।
এরপর কী বলল তেমন কিছুই বুঝিনি। তবে এতটুকু বুঝলাম, ওদের জন্যও খাবার আনতে হবে।
এর পর কোনোরকমে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবকে সব খুলে বললাম। ইমাম সাহেব ছিলেন মাটির মানুষ। বললেন, ব্যাটা ভয় পাস না। তুই স্যারের কাছে যা, আর সব খুলে বল।
আমি অবাক হলাম। ইমাম সাহেবও তা হলে সব জানেন!
স্যারের কাছে এসে সব বললাম। স্যার শুনে আমাকে বাহবা দিলেন। বললেন, খবর পেয়েছি ওই তিনজন এ এলাকার নজরদারির দায়িত্বে আছে। কাল একটা ছোট অপারেশন হবে, আর সেই অপারেশন তোকেই করতে হবে।
স্যার এরপর সব বুঝিয়ে দিলেন।
পরদিন আবার ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পাকসেনাদের আসার অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর ওরা এল। আকারে-ইঙ্গিতে বোঝালাম, তোমাদের জন্য খাবার নিয়ে এসেছি!
খুশিতে পাকসেনাগুলোর দাঁত বেরিয়ে পড়ল। তিনটা টিফিন বক্স, সব শেষেরটাতে বোমা। এর পর স্যারের কথামতো পানি আনার ছুতোয় দূরে সরে গেলাম। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরই বিকট শব্দ হলো।
আর অপেক্ষা না করে স্যারের বাড়িতে চলে এলাম।
স্যার যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিলেন। মাথায় হাত দিয়ে বললেন, শাবাশ ব্যাটা! তুই আমাদের চেয়েও অনেক এগিয়ে গেলি।
সেই দিনের খুশিটা বেশিক্ষণ থাকল না। ওই রাতেই আরেকটা অপারেশনে স্যার মারা গেলেন।
এতক্ষণ বেশ মনোযোগ দিয়ে যুদ্ধদিনের গল্প শুনছিল নিহান। দাদুর চোখে পানি দেখে একটা রুমাল এনে দাদুর চোখ মুছে দিল।