চট্টগ্রামের বাজারগুলোতে ভোজ্যতেলের সংকট দেখা দিয়েছে। ভোক্তা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সবাই বলছেন এটি ‘কৃত্রিম সংকট’। মূলত রমজান মাসের বাড়তি চাহিদাকে পুঁজি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে এই সংকট তৈরি করেছেন। খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নামিদামি কোম্পানিগুলো ঠিকমতো ভোজ্যতেল সরবরাহ করছে না। কিন্তু এই খুচরা বিক্রেতারাই ভোজ্যতেলের চাহিদাকে ঢাল বানিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি অর্থ আদায় করছে। সাম্প্রতিক সময়ের অভিযানে এমন প্রমাণও পেয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম মহানগরের হালিশহর, উত্তর আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, চকবাজার, রিয়াজউদ্দিন বাজার ও কাজীর দেউড়ি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য পণ্য পাওয়া গেলেও অনেক দোকানে তেলের অস্তিত্ব মেলেনি। কাজীর দেউড়ি এলাকার একটি দোকানে ছয়টি বোতলজাত সয়াবিন তেল (এক লিটার ওজন) পাওয়া যায়। ক্রেতা সেজে দাম জানতে চাইলে দোকানি ২০০ টাকা চান। অথচ বোতলের গায়ে লেখা ১৭৫ টাকা। এদিকে হালিশহর এলাকায় অনেক ঘোরাঘুরির পর একটি দোকানে ১৫টি বোতলজাত সয়াবিন তেল (৩ লিটার ওজন) পাওয়া যায়। তিনিও বাড়তি দাম চান।
খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, রমজান মাস ঘনিয়ে এলেও কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেল ঠিকমতো সরবরাহ করছে না। নগরের হালিশহর এলাকায় আল মদিনা স্টোরের মালিক মো. নাছির বলেন, ‘একটি কোম্পানির ডিলারের কাছে ১৫ কার্টন সয়াবিন তেল চেয়েছিলাম। আজ পাঁচ কার্টন দিয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ রোজাকেন্দ্রিক বাজার করছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কম। অনেক ডিলার অন্য পণ্য যেমন- সরিষার তেল কেনার শর্তে সয়াবিন দিচ্ছে, তাই বিরক্ত হয়ে অনেক খুচরা ব্যবসায়ী সয়াবিন তেল রাখছেন না। এ কারণে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।’
কিন্তু কোম্পানিগুলো দাবি করছে, যথাযথভাবে ভোজ্যতেল সরবরাহ করা হচ্ছে। মেঘনা গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (ট্রেনিং) নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছি। আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। অন্যরা কী করছে বা বাজারে সরবরাহ সংকট কেন, সেটা বলতে পারব না।’
সম্প্রতি নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার, মোমিন রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তারা জানিয়েছে, কোম্পানিগুলো ঠিকঠাক সরবরাহ করছে, কিন্তু খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব তেল দোকানের ভেতর লুকিয়ে রাখছেন। অল্প অল্প করে বের করে বাড়তি দরে বিক্রি করছেন।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি নগরের কাজীর দেউড়ি বাজারে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার। রমজানকে ঘিরে ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, বোতলের গায়ে উল্লিখিত প্রকৃত মূল্য মুছে বেশি দামে বিক্রি করায় ছয় প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। বাসায় তেল মজুত করায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নগরের রহমানগঞ্জ আবদুস সাত্তার রোড এলাকায় একাধিক দোকানকে জরিমানা করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি একই অপরাধে রিয়াজউদ্দিন বাজারের এক দোকানিকে জরিমানা করা হয়।
ব্যবসায়ীরা জানান, সারা বছর দেশে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকলেও শুধু রমজান মাসেই চাহিদা থাকে প্রায় তিন লাখ টন। বন্দর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত বছরের নভেম্বরে ১ লাখ ১২ হাজার ৫৯৩ টন, ডিসেম্বরে ২ লাখ ২২ হাজার ৮৫৩ টন এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মিলিয়ে ৩ লাখ ৪২ হাজার ৫২৭ টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে।
কাজীর দেউড়ি এলাকার বাসিন্দা সোহরাব হোসেন বলেন, ‘বুধবার অলিগলিরে সব খুচরা দোকান ঘুরে এক লিটার সয়াবিন তেল পাইনি। দোকানিদের একটাই কথা- তেল নেই। খুব দুঃখজনক। অথচ টেলিভিশন, সংবাদপত্রে দেখছি গতবারের তুলনায় আমদানি বেড়েছে। তা হলে এত তেল গেল কোথায়?’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘গতবারের তুলনায় আমদানি বেড়েছে, কিন্তু আমদানিকৃত ভোগ্যপণ্যের সুষ্ঠু বণ্টন হচ্ছে কি না- সেটা খতিয়ে দেখা জরুরি। পাশাপাশি ভোজ্যতেল মজুত করা, ইচ্ছাকৃত কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি অর্থ আদায় করা জঘন্য অপরাধ। তাদের শুধু জরিমানা করলে হবে না, জেলও দিতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘আমরা সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে দেখেছি, বোতলজাত সয়াবিন তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা চাহিদাকে পুঁজি করে মজুতের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। তারপর বাড়তি দামে বিক্রি করছে। আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। সয়াবিন তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’