কাঁচা পাটের তীব্র সংকটে বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) ও বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ)। এ পরিস্থিতিতে তাদের অধিভুক্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
সংকটের কারণে কাঁচা পাটের দামও অনেকটা বেড়ে গেছে। বিজেএমএ সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার প্রতি মণ পাট ৫ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের সব পাটকল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে তারা এ কথা বলে বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিনকে গত সোমবার চিঠি দিয়েছে দুই সংগঠন। এই সংগঠন দুটি হলো ২০০ পাটকল মালিকদের সংগঠন বিজেএমএ ও ৬০টি পাটকলের সংগঠন বিজেএসএ।
পাট উপদেষ্টাকে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, বাজারে কাঁচা পাটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে পাটকলগুলো তা কিনতে পারছিল না, ক্রেতাদের চাহিদামাফিক উৎপাদনও করতে পারছিল না। বিষয়টি গত বছরের ২৮ আগস্ট পাট উপদেষ্টাকে লিখিতভাবে জানিয়েছিল দুই সংগঠন। উপদেষ্টা তখন তাদের ডেকে বৈঠক করেন। কাঁচা পাট রপ্তানিতে এরপর গত ৮ সেপ্টেম্বর শর্ত আরোপসহ পরিপত্র জারি করা হয়। ফলে কাঁচা পাট রপ্তানি কমলেও বাজারে এর সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। চিঠিতে এসব কথা উল্লেখ করা হয়।
যোগাযোগ করলে বস্ত্র ও পাট উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘পাট খাতের বিদ্যমান সমস্যা কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিজেএমএ ও বিজেএসএ হঠাৎ চিঠি দিয়েছে। যেহেতু চিঠি দিয়েছে, সেহেতু আমরা তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসব। তবে এটা ঠিক বর্তমানে পাটের যে দাম, তা পাটচাষিরা পাচ্ছেন না; এ দাম পাচ্ছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।’
বাণিজ্য উপদেষ্টার কাছে পাঠানো চিঠিতে সংগঠন দুটি জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পাটের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এ সুযোগে কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী কাঁচা পাট মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। তাদের ভাষ্য, পাটকল বন্ধ হয়ে গেলে শ্রমিকদের বেকারত্ব বাড়বে, আয় কমবে বৈদেশিক মুদ্রার। স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
বস্ত্র ও পাট সচিব বিলকিস জাহান রিমির সঙ্গে ১৩ জানুয়ারি বৈঠক করে বিজেএমএ ও বিজেএসএ। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাট অধিদপ্তরে মজুতদারদের তালিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে ২১ জানুয়ারি পাট অধিদপ্তরে বিজেএমএ, বিজেএসএ ও কাঁচা পাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএ) উপস্থিতিতে যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বস্ত্র ও পাট সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে পাটকলগুলোর কাঁচা পাটের চাহিদা নির্ধারণ এবং নগদ মূল্যে মজুত পাটকলগুলোতে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন, ভারতে রপ্তানির জন্য যে পরিমাণ কাঁচা পাট মজুত আছে, পাটকলগুলোকে তা দেওয়া হলে তারা উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
সেখ বশির উদ্দিনকে পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়, পাট অধিদপ্তর থেকে মজুতদারদের বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা নামমাত্র। মজুতদারদের হাত এত শক্তিশালী যে তারা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে চলছেই এবং মজুত পাট কিছুতেই বাজারে ছাড়ছে না।
তবে পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মো. নূরুল বসির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘নামমাত্র পদক্ষেপের অভিযোগ ঠিক নয়। স্বল্প জনবল নিয়েও আমরা তালিকা ধরে অভিযান বাড়িয়েছি। লাইসেন্সধারী রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে অবৈধ মজুতের বিষয়টি খাটে না। রপ্তানি সংকুচিত হওয়ায় তারা পাট ছেড়ে দেবেন বলে আশা করছি।’
কাঁচা পাট রপ্তানিতে শর্ত দেওয়ার আগে গত আগস্টে সেখ বশির উদ্দিনের কাছে করা বিজেএমএ ও বিজেএসএর যৌথ আবেদনে জানানো হয়েছিল, পাটের ভরা মৌসুমে প্রতি মণ পাটের দাম ৩ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ৪ হাজার টাকা। অথচ আগের বছরগুলোতে প্রতি মণ পাটের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৩ হাজার ২০০ টাকা। গতকাল সোমবার একই মানের পাট প্রতি মণ ৫ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে বিজেএমএ সূত্রে জানা গেছে।
মজুতদারদের বিরুদ্ধে সরকারি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে বিজেএমএ ও বিজেএসএ বলেছে, বিজেএর সদস্যদের বিভিন্ন গুদামে মজুত থাকা কাঁচা পাট যৌক্তিক মূল্যে পাটকলগুলোকে সরবরাহ করার বিষয়ে যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। না হলে বিজেএমএ ও বিজেএসএ আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে সব পাটকল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে।
বিজেএসএ চেয়ারম্যান তাপস প্রামাণিক বলেন, ‘দেশীয় পাটকলগুলোকে না দিয়ে ভারতীয় পাটকলগুলোর কাঁচা পাটের চাহিদা মেটাচ্ছে মজুতদারেরা। এটা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ।’
কাঁচা পাট রপ্তানিতে শর্ত আছে জানালে তাপস মজুমদার বলেন, ‘কিছুদিন দমে ছিলেন মজুতদাররা। এখন তারা নতুন করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং দাম আরও বাড়িয়েছে।’
দেশের পাটজাত পণ্য রপ্তানি বছর বছর কমছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১১২ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে হয় ৯১ কোটি ১৫ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আরও কমে হয় ৮৫ কোটি ৫২ লাখ ডলার। বিজেএসএ সূত্রে জানা গেছে, বছরে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল কাঁচা পাট উৎপাদিত হয় দেশে। এর মধ্যে পাটপণ্য উৎপাদনের জন্য লাগে ৬০ লাখ বেল।
পাট অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, চীনসহ ১৩টি দেশে ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩৫ বেল কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। ওই অর্থবছরে ১ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা বা ১৬ কোটি ৪ লাখ ৮৭ হাজার মার্কিন ডলারের কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে। মোট রপ্তানি আয়ের মধ্যে ৯ কোটি ডলারের বেশি এসেছে ভারত থেকে।