পরিবেশের স্বস্তির বিপরীতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে রাজশাহীর ছাপাখানা শিল্প। নির্বাচন এলেই যে শিল্প খাত সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করত, এবার সেই শিল্পেই নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। পোস্টার ছাপানোর কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাজশাহীর অধিকাংশ প্রেসে মেশিন বন্ধ, কর্মচারীরা বসে বসে অলস সময় পার করছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে এবার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সারা দেশের মতো রাজশাহীতেও নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে এক সময় নির্বাচন এলেই সাদা-কালো পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া রাজপথ, অলিগলি-মহল্লা ও বিদ্যুতের খুঁটি—সবই এখন প্রায় পোস্টারশূন্য। সীমিত সংখ্যক পরিবেশবান্ধব ব্যানার, ফেস্টুন ও হ্যান্ডবিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে প্রার্থীদের প্রচারণা।
দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রচারণার ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছেন, রাস্তাঘাটে পোস্টার না থাকায় নির্বাচনের আমেজ অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। আবার অন্যদিকে পরিবেশ কর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, এতে শহরের সৌন্দর্য রক্ষা ও পরিবেশ দূষণ কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ছাপাখানা সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজশাহীতে বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি প্রেস রয়েছে। পোস্টার নিষিদ্ধ না হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে এসব প্রেস মিলিয়ে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার ব্যবসা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ, মেয়র কিংবা সংসদ নির্বাচনে শুধু পোস্টার ও কাগজ থেকেই কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হতো।
নগরীর হকার্স মার্কেটে অবস্থিত ঢাকা প্রেসের স্বত্বাধিকারী শাহজাহান আলী বলেন, নির্বাচন মানেই আমাদের জন্য সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় এবার কোনো অর্ডারই নেই। কাগজ, কালি, বিদ্যুৎ আর মেশিন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মিলিয়ে বড় লোকসানে পড়েছি।
একই সুরে কথা বললেন সাগর অফসেট প্রিন্টিং প্রেসের মালিক রফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, ডিজিটাল প্রচারণা থাকলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো পোস্টারের বড় চাহিদা ছিল। নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই সুযোগও হারিয়েছি। ব্যাংক ঋণ নিয়ে প্রেস চালাচ্ছি—ঋণ শোধ করব কীভাবে বুঝতে পারছি না।
নিউ শাহিন প্রেসের স্বত্বাধিকারী শাহিন আলী বলেন, আগে নির্বাচনের সময় রাতে ঘুমানোর সময় থাকত না। কখনো রাত ১টা, কখনো সারা রাত মেশিন চালাতে হতো। এবার শুধু হ্যান্ডবিলের অল্প কিছু কাজ আসে। এক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ শেষ। বাকি সময় বেকার বসে থাকতে হচ্ছে।
শুধু মালিকরাই নন, ছাপাখানার শত শত কর্মচারীও পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়। নগরীর ষষ্ঠতলায় একটি প্রেসে দীর্ঘদিন কাজ করা আলাউদ্দিন বলেন, নির্বাচনের সময় বাড়তি কাজ করতাম, ওভারটাইম পেতাম কিন্তু এখন আর কাজ নেই। মালিক বলছে বেতন দিতে পারবে না, তাই পরিবার নিয়ে বর্তমানে খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।
আরেক কর্মচারী রনি হোসেন জানান, দুই সপ্তাহ ধরে ঠিকমতো কাজ নেই। দিনে আয় করে দিন চালাতাম। এখন ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
রাজশাহী ছাপাখানা মালিক সমিতির সভাপতি ও আহমেদ প্রেসের স্বত্বাধিকারী আহমেদ বেলাল বলেন, নির্বাচন মানেই ছাপাখানা শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় কর্মব্যস্ত সময়। পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় এবার সেই ব্যবসা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কর্মচারীরা বসে আছে, প্রেসে কাজ নেই। অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ, মেয়র কিংবা সংসদ নির্বাচনে শুধু কাগজ ও পোস্টার থেকেই কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হতো। রাজশাহীতে যে পরিমাণ কারখানা আছে সে অনুযায়ী আমাদের ব্যবসায় অনেক লাভ থাকত। কিন্তু এখন বেকার সময় পার করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ পোস্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের সাময়িকভাবে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একজন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি এই সিদ্ধান্তটি দেশের জন্য ভালো হয়েছে। কেননা, পোস্টারের কারণে আগে বিপুল পরিমাণ কাগজ দ্বারা রাস্তাঘাট নষ্ট হতো। কাগজের দাম বেড়ে যেত, যার প্রভাব পড়ত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা কাগজ কিনতে পারত না, লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটত। এবার অন্তত সেই ভোগান্তি থেকে মানুষ মুক্তি পেয়েছে।