শীত মৌসুম শুরু হতেই পদ্মা নদীতে তীব্র নাব্যসংকট দেখা দেওয়ায় প্রায় তিন মাস ধরে কার্যক্রম অচল হয়ে আছে ফরিদপুর সিএন্ডবি ঘাট নৌবন্দর। নদীর বুকে অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠা, পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া এবং নৌপথে সঠিক গভীরতা না থাকায় পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো ও বড় ট্রলার চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলসহ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ এই নৌবন্দরটির স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার ক্ষতিসহ হাজারও শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
নদীপথে দূর-দূরান্ত থেকে পণ্য নিয়ে আসা সব বড় জাহাজ এখন মাঝনদীতে আটকা পড়ে থাকছে। অনেক জাহাজ ডুবোচরে বসে যাওয়ায় বন্দরে ভিড়তে পারছে না। ফলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, পণ্য বোঝাই, গুদামজাতকরণ ও পরিবহন- সবকিছুই স্থবির হয়ে পড়েছে। বন্দরের ওপর নির্ভরশীল হাজারও শ্রমিক এখন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে।
অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
শত বছরের পুরোনো ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সিঅ্যান্ডবি ঘাট নৌবন্দরটি একটি পূর্ণাঙ্গ নৌবন্দর হিসেবে সরকারিভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৫ সালে। পরবর্তী সময় এটি দ্বিতীয় শ্রেণির নৌবন্দরে উন্নীত হয়। ২০১৭ সালের থেকে নদীবন্দর হিসেবে ইজারা প্রদান করে রাজস্ব আয় করছে সরকার। কিন্তু সরকারের রাজস্ব খাতে নিয়মিত রাজস্ব জমা পড়লেও ঘাটের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে ঘাট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতার খুবই অভাব বলে দাবি করেন স্থানীয় জাহাজ ব্যবসায়ী।
পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
এ বন্দর দিয়ে বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়ে থাকে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে গেলে প্রায় প্রতিবছর নাব্যসংকট দেখা দেয়। তবে এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই বন্দর দিয়েই ফরিদপুরের সোনালি আঁশখ্যাত পাট চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। এ ছাড়া সিলেট অঞ্চল থেকে কয়লা ও বালু, নারায়ণগঞ্জ থেকে সিমেন্ট, কুমিল্লা ও অন্যান্য জেলা থেকে বিভিন্ন শিল্পপণ্য নিয়মিত এ নৌপথে পরিবহন করা হয়। বন্দর অচল থাকায় এসব পণ্যের পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রাজস্ব আদায়ে ধস
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ নৌবন্দর থেকে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় বন্দরটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত তিন মাস কার্যক্রম বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায় কার্যত শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
বর্তমান ইজারাদার মো. মজিবুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছেন তিনি। ইতোমধ্যে প্রায় ২৫টি লিখিত আবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু না হলে আর্থিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়বেন।
মাঝনদীতে আটক জাহাজ
নাব্যসংকটের কারণে অনেক পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়তে না পেরে কয়েক কিলোমিটার দূরে মাঝপদ্মায় অবস্থান করছে। ডুবোচরে আটকাপড়া এসব জাহাজ থেকে ছোট ছোট ট্রলারে করে পণ্য আনা-নেওয়া করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে ব্যবসায়ীরা বাড়তি খরচ বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বড় ব্যবসায়ী আলম শেখ খবরের কাগজকে জানান, গত তিন মাসে তার এককভাবে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণবঙ্গের ব্যবসায়িক পণ্য আনা-নেওয়ার জন্য এই বন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নাব্যসংকট দ্রুত সমাধান না হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’
শ্রমিকদের কঠিন জীবন
বন্দরকেন্দ্রিক শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা এখন চরমে। জাহাজ না আসায় পণ্য বোঝাইয়ের কাজ নেই। ফলে প্রতিদিনের আয় বন্ধ হয়ে গেছে।
শ্রমিক লালন জানান, তিনি নওগাঁ থেকে এসে এখানে কাজ করেন। প্রতিদিন কাজ না থাকায় নিজের খাওয়াদাওয়া চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়িতে নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারছেন না।
আরেক শ্রমিক নুরুল শেখ খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই কাজের ওপরই আমার সংসার চলে। দুই সন্তান পড়ালেখা করে। আয় না থাকায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।’
রমজান নামে এক কুলি জানান, টানা তিন মাস বেকার থাকায় পরিবার নিয়ে চরম সংকটে আছেন। দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করে নৌপথ সচল করার জোর দাবি জানান তিনি।
প্রশাসনের মত
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লা বলেন, নাব্যসংকটের কারণে বন্দরটি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত খননকাজ শুরুর আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বন্দরসংশ্লিষ্ট সূত্রও বলছে, নাব্যসংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। নদীর যেসব স্থানে ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে, সেসব এলাকায় দ্রুত খনন না করলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা নদীর নাব্য বজায় রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। নিয়মিত ড্রেজিং, নদীপথ চিহ্নিতকরণ এবং আধুনিক নৌপথ ব্যবস্থাপনা চালু না করলে প্রতিবছরই একই সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
ফরিদপুর সিঅ্যান্ডবি ঘাট নৌবন্দর শুধু একটি আঞ্চলিক বন্দর নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের জন্য এ নৌপথ অত্যন্ত সাশ্রয়ী। সড়কপথের তুলনায় কম খরচে ও দ্রুত পণ্য পরিবহনের সুবিধা থাকায় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে এ বন্দরের ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু নাব্যসংকট দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসায়ীরা বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হবেন, যা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। এতে পণ্যের বাজারদরও বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে হাজারও শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দ্রুত ড্রেজিং কার্যক্রম শুরুর মাধ্যমে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে আনা হবে। অন্যথায় ফরিদপুরের এই ঐতিহ্যবাহী নৌবন্দর আরও বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।