নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে গত ৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে এক ভাষণ দেন। সেখানে তিনি ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেন। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল স্বাগত জানালেও কারও কারও প্রতিক্রিয়া ছিল ভিন্ন রকম।
অপরদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম একই কথা বলেছেন, নির্ধারিত সময় ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি আরও বলেছেন, নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি দপ্তর ইতোমধ্যে প্রস্তুতির কাজে নেমেছে। প্রধান উপদেষ্টা এবং নির্বাচন কমিশনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘোষণার পরও নির্বাচন হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। বরং নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের হুমকি-ধমকিতে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে।
জামায়াত, এনসিপিসহ দু-একটি দল জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং এসব সনদের ভিত্তিতে পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের কথা বলেছে। এরই মধ্যে গত ১২ আগস্ট এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বিএনপি ও জামায়াত নেতার উপস্থিতিতে জাতীয় যুবশক্তির সম্মেলনে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে না বলে মন্তব্য করেন।
নির্বাচন হলে শহীদদের জীবন, আহতদের অঙ্গ ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। একই সঙ্গে সংস্কার, জুলাই সনদ ও সংবিধান পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
একই ইস্যুতে জামায়াত মনে করে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম হতে পারে। নির্বাচনের সময় ঘোষণাকে ইতিবাচক বলা হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াত ও এনসিপির হুমকি বিএনপির ওপর চাপ তৈরির কৌশল হতে পারে। জানা গেছে, পিআর পদ্ধতি ছাড়া নির্বাচনে নাও যেতে পারে কয়েকটি দল। আবার সরকারের ভেতরে একটি অংশের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করার ব্যাপারে জোরালো আপত্তি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে সংস্কার বাস্তবায়ন, জুলাই সনদ কার্যকর, জুলাই ঘোষণাপত্রের আইনি ভিত্তি দেওয়া, সংবিধান পরিবর্তন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দাবিসহ একের পর এক ইস্যু পরিকল্পিতভাবে তৈরি করছে একটি পক্ষ। নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্রের একটি অংশ হিসেবে এসব ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে।
নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই এক ধরনের চাপ অনুভব করছে জামায়াত ও এনসিপি। ভোটের রাজনীতিতে তাদের এককভাবে জিতে আসার সম্ভাবনা কম। এজন্য তারা বিভিন্ন দাবি বা শর্ত তুলে এক ধরনের চাপ তৈরি করতে চাইছে। এনসিপি আসন নিয়ে দর-কষাকষি বা সমঝোতার চিন্তা থেকেও বিএনপির ওপর চাপ তৈরির কৌশল নিতে পারে বলেও মনে করছে দলটির হাইকমান্ড। তবে এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনি জোট হবে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচার দাবি তুলছে কোনো কোনো দল। সংকট থেকে বের হয়ে আসতে সব দলের মধ্যে ঐকমত্য দরকার। নির্বাচনের আগে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। যেসব ইস্যুতে ঐকমত্য জরুরি, সেগুলোতে পদক্ষেপ নিতে হবে। সেখানে অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যমান উদ্যোগ না নিলে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।
নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটাতে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনি তফসিল ও রোডম্যাপ ঘোষণা এখন সময়ের দাবি। ইতোমধ্যে সরকারের নির্দেশনায় নির্বাচন কমিশন তাদের কাজ শুরু করেছে। এর পরও রাজনৈতিক দলগুলোর মাঠের বক্তব্যে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। ক্রমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তুষ্টি বাড়ছে। জটিল পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতা ও ঐক্যে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় দেশের গণতন্ত্র হুমকির মধ্যে পড়বে। আশা করছি, সরকার দেশের কল্যণার্থে গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে সক্ষম হবে।