দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার বেশ চ্যালেঞ্জিং। জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেও নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রণে রাখা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হতাহতের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে অস্ত্র হামলার মহড়া, রাজনৈতিক সহিংসতা হানাহানি, টার্গেট কিলিং এবং পেশাদার অপরাধীদের নানামুখী তৎপরতা। এসব কারণে নির্বাচনের মাঠ ব্যাপক অস্থিতিশীল বা ভীতিকর হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা। গত শুক্রবার রাজধানীর পল্টন এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। এ ঘটনা জাতীয় নির্বাচনের আগে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। টার্গেট হামলা, কিলিংসহ দেশে নানা ঘটনা ঘটতে পারে। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে আরও সতর্ক থাকতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লুট হওয়া প্রায় ১ হাজার ৩৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি ওই সময়ে জেল ভেঙে পালিয়ে যাওয়া অন্তত ৭০০ জন দুর্ধর্ষ আসামি এখনো লাপাত্তা। এর বাইরেও পেশাদার অপরাধী শুটার বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীরা মাঝেমধ্যে নিজের অবস্থান জানান দিচ্ছে। সব মিলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের এত বড় বিপর্যয় আর কখনো ঘটেনি। দেড় বছরেও পুলিশবাহিনী সেভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের যথেষ্ট ঘাটতি দেখা গেছে। এরকম দুর্বল অবস্থার মাঝেও পুলিশ যা করছে তা সন্তোষজনক। জাতীয় নির্বাচনের মতো আয়োজনে শুধু পুলিশের ওপর ভরসা করার সুযোগ নেই। সরকার ও রাষ্ট্রকে এখন তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বুঝতে হবে। এখানে সক্ষমতা প্রদর্শনের বিষয়টিও জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনের পূর্ব শর্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা। আমরা দেখলাম তফসিল ঘটনার পরই রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। একে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছি। এ ধরনের ঘটনা নির্বাচনের মাঠে রাজনৈতিক সহাবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা খুব জরুরি। তাই নির্বাচনের আয়োজনের সঙ্গে ইসিসহ যাদের বিভিন্ন ধরনের ভূমিকা বা সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। অপরাধীদের তৎপরতা রোধে জনগণকেও সচেতন করতে হবে।
দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অপরাধীরা এখন অনেকটা সক্রিয়। এ ক্ষেত্রে একটি জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে জনমানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বদা সজাগ থাকবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, বৈধ বা লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে রাখা, চিহ্নিত বা পেশাদার অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা নির্বাচনের আগে খুবই জরুরি। বিভিন্ন অপরাধের বিচার না হওয়ায় সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি, জাতীয় নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সক্ষমতা অর্জন করে দেশের অপরাধ কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।