আজ ১৬ ডিসেম্বর। আমাদের বিজয় দিবস। অহংকার ও গৌরবের মুহূর্ত। বাংলাদেশের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম সোনালি দিন। হাজার বছর ধরে বাঙালির যে আকুতি ছিল, আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বাধীনতার, এই দিনেই তা অর্জিত হয়। এ জন্য দীর্ঘ নয় মাস এ ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীকে সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রায় ৯১ হাজার ৬৩৪ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
স্বাধীনতার তাৎপর্য অপরিসীম। এ অঞ্চলের মানুষ যে নানান সূত্রে এক ও অভিন্ন, স্বাধীনতার মধ্যদিয়ে তার প্রতিষ্ঠা ঘটে, উন্মেষ ঘটে বাঙালি জাতিসত্তার। সেই জাতীয়তাবাদ উগ্র ছিল না, ছিল উদার গণতান্ত্রিক। এরকম একটা রাষ্ট্রের স্বপ্ন থেকেই জন্ম হয় বাংলাদেশের। একদিনে এ বোধে পৌঁছায়নি এ দেশের মানুষ।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হয়। ‘মুসলিম’ ভাবধারায় পূর্ব ও পশ্চিম, হাজার মাইলের দূরবর্তী দুই ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পরবর্তী দীর্ঘ ২৫ বছরে এ দেশের মানুষ নানা বঞ্চনা ও সংগ্রামের মধ্যদিয়ে উত্তীর্ণ হয় ‘বাঙালি’ জাতিসত্তার বোধে। বাংলাদেশের বাঙালিদের এ বোধটা প্রথম এসেছিল ভাষার সূত্রে। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম করতে গিয়ে তারা বুঝেছিলেন, হাজার মাইল দূরের ভূখণ্ডে বসবাস করা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে তার কোনো ঐক্য বা মিল নেই; কী ভাষায়, কী সংস্কৃতিতে, কী জীবনযাপনে। উপরন্তু ছিল সীমাহীন বঞ্চনা। পাকিস্তানি শাসনক্ষমতায় সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের। এ বঞ্চনার বিরুদ্ধে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আন্দোলন গড়ে তোলেন। শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে ‘ছয় দফা’ দাবি তুলে ধরেন। এতে বাঙালিদের সার্বিক মুক্তির রূপরেখা তুলে ধরা হয়। সামগ্রিকভাবে মূল দাবিটা ছিল স্বাধিকারের, অর্থাৎ নিজেদের অধিকার আদায়ের। এ আন্দোলন মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের এতটাই সমর্থন পেয়েছিল যে, তৎকালীন পাকিস্তানি শাসক জেনারেল আইয়ুব খানের তখততাউস কেঁপে ওঠে। আন্দোলনে ভীত হয়ে জেনারেল আইয়ুব সামরিক শাসন জারি করেন। এতে বাঙালিদের সংগ্রাম স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ঘটে যায় গণ-অভ্যুত্থান। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানি মুজিবের মুক্তির আন্দোলনে সমর্থন দেন। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে পতন ঘটে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের। ক্ষমতার আসনে বসেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আরেক জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান। ক্ষমতায় বসেই তিনি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন। জনরায়ই হোক শেষ কথা। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। মুজিবের এ বিজয়ে শাসনক্ষমতা যে বাঙালিদের হাতে চলে আসছে, একথা বুঝতে পেরে ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তরে গরিমসি করতে থাকেন।
এল একাত্তরের মার্চ। পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে অসহযোগের ডাক দিলেন বঙ্গবন্ধু। ভেতরে ভেতরে আরেক দিকে চলছিল সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা ‘অপারেশন সার্চলাইটে’-এর নামে গণহত্যা শুরু করলে শুরু হয়ে যায় সশস্ত্র স্বাধীনতাযুদ্ধ। মুক্তির চূড়ান্ত লড়াই। টানা নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালি বিজয় অর্জন করে। এই ডিসেম্বর মাসেই ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার সূর্য।
অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় হয়ে গেল বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীনতার মূল কথা ছিল মানুষের সার্বিক মুক্তি। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়- এ দেশের মানুষ যাতে সব ধরনের অধিকার পায়, আত্মবিকাশের সুযোগ উন্মুক্ত হয়; সেটাই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল অনুপ্রেরণা। সেই লক্ষ্য যে পূরণ হয়নি, সব ধরনের সূচক এবং আমাদের জীবনযাপনে তা স্পষ্ট। চব্বিশের অভ্যুত্থানও হয়েছিল এই একই অনুপ্রেরণায়। কিন্তু ইতোমধ্যে দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কাগুজে সংস্কারের কথা শোনা গেছে, বাস্তবে কিছুই ঘটেনি। এমনকি এই মুহূর্তে সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন হবে কি না, সে বিষয়েও বাংলাদেশের অনেক মানুষ সন্দিহান।
ইতোমধ্যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও দেখা দিয়েছে। যে স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ২ লাখ নারী, অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যদিয়ে প্রথমে ২৪ বছর এবং পরে নয় মাস ধরে সংগ্রাম করতে হয়েছিল; সেই স্বাধীনতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। দেশের নানা স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রায় সব স্মারক গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বেড়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি। সম্প্রতি আইনশৃঙ্ক্ষলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। সাধারণ মানুষ একদিকে খেয়েপড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে, অন্যদিকে ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। এরকম রাষ্ট্র কখনই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র হোক যেখানে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারেন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার অশুভ প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শ- সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা ও উদার গণতান্ত্রিক ধারায় দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ে তুরতে হবে- এটাই হোক অঙ্গীকার।