আরও একটি বছর অতিক্রান্ত হলো। আমাদের পৃথিবী প্রবেশ করল খ্রিষ্টীয় (গ্রেগরীয়) নতুন বর্ষে। নতুন সূর্য নতুন দিন নিয়ে এল। এই সেই প্রথম দিনের সূর্য, যার সঙ্গে মানবসত্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেছিলেন প্রাচ্যের মহান ভাবুক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রথম দিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল, সত্তার নূতন আবির্ভাবে–কে তুমি। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার মধ্য দিয়েই আমরা মানবজীবনের অর্থ খুঁজে পাই। কী পেয়েছি, আর কী হারিয়েছি, বুঝে নিতে চাই। এরপর আমাদের দৃষ্টি থাকে ভবিষ্যতের দিকে। মানুষ ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে স্মৃতিতে বাঁচে, বলেছিলেন দার্শনিক সিসেরা। বিগত এক বছরে আমরা হারিয়েছি অনেক কিছু। অর্জন তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। ব্যক্তিজীবন, রাষ্ট্রীয়জীবন এবং বহির্বিশ্বের নানা ঘটনা আমাদের আন্দোলিত করেছে। আমরা বেদনার্ত হয়েছি। সামান্য অর্জনে হয়েছি উৎফুল্ল। অপ্রাপ্তির বেদনা আমাদের আক্রান্ত করেছে সবচেয়ে বেশি।
চব্বিশের অভ্যুত্থান দেশের মানুষের মনে একধরনের স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল। সেই স্বপ্ন একটা সুন্দর দেশের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণের পথে আমরা দেখছি বাধা অনেক। পুরো পথটাই কণ্টকাকীর্ণ। বিগত বছরটিতে বাংলাদেশের মানুষ মব-সন্ত্রাস নিয়ে উদ্বিগ্ন থেকেছে। কে কোথায় আক্রান্ত হবেন, কার জীবনদীপ অপঘাতে নিভে যাবে, কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। মাঝে মাঝে শুধু সামাজিক যোগাযোগ অথবা গণমাধ্যমে মৃত্যুর নির্মম ঘটনা প্রকাশিত হতো। বছরের শেষ দিকে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট-উদীচী আর গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ তো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে কাঁপিয়ে দেয়। বাউলদের ওপর যে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তাও ছিল যেমন পৈশাচিক, তেমনি নির্মম। এই নির্মমতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে সনাতন ধর্মের এক যুবককে পুড়িয়ে মারার মধ্য দিয়ে। আগের মতোই মাজার আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছে। মানুষের কবরও এই আগ্রাসী অমানবিক অগ্নিসন্ত্রাস থেকে রেহাই পায়নি। ধর্মান্ধতার কুফল হিসেবে এসব নিন্দনীয় অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। সবমিলিয়ে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক।
সংস্কার নিয়ে প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। সেই প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি। জনজীবনে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো দুর্নীতি, অপশাসন, জনদুর্ভোগের মধ্য দিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন কাটছে। আন্দোলনে জেরবার ছিল রাজধানী ঢাকা। সরকার সেসব দমনে বা না-হতে-দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়নি। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা। শিক্ষার মান আগের তুলনায় আরও নেমে গেছে। শিক্ষার্থীদের অপরিমেয় ক্ষমতায়ন শিক্ষকদের কোণঠাসা করে অনিশ্চয়তা এবং বিপন্নতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষ ছিল দিশেহারা। জিনিসপত্রের দাম, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম হয় বেড়ে গেছে অথবা উচ্চমূল্যে স্থির থেকেছে। দেশে বেড়েছে দারিদ্র্যের হার, বেকারত্বের হার। বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগ ছিল শূন্যের কোঠায়। অনেক শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন। তাদের কথা শোনার কেউ ছিল না। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গিয়ে আমানতকারীদের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ভূরাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রেও আমাদের তেমন সাফল্য নেই, বরং টানাপোড়েন তীব্র হয়েছে।
এতকিছুর মধ্যে মানুষ স্বস্তি খুঁজে পেতে চেয়েছে সাধারণ নির্বাচনে। প্রতিশ্রুত নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে এখনো চলছে। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা। ঘোষিত-অঘোষিত নানাভাবে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারার খবর গণমাধ্যম কর্মীদের অজানা নয়। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই শঙ্কা দূর হবে না। প্রকৃতপক্ষে অন্তর্ভুক্তিমূলক অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার প্রধান শর্ত। নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, অন্য কোনো বিকল্প নেই।
বিগত বছরটির বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ছিল দ্বন্দ্ব-সংঘাতে বিপর্যস্ত। ফিলিস্তিনে গণহত্যা অব্যাহত থেকেছে। ইরান-ইসরায়েল এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ উপমহাদেশে নিরাপত্তার শঙ্কা তৈরি করেছে। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধও থামেনি। বিশ্বের এসব স্থানে রক্ত ঝরছেই আর বিপর্যয়ে থেকে যাচ্ছে পৃথিবীর মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও নানাভাবে পৃথিবীকে অস্থির করে রেখেছেন।
জীবন যেখানে থমকে দাঁড়ায়, সেখান থেকে শুরু হয় নতুন চলা। চারপাশের নিঃসীম অন্ধকারে রবীন্দ্রনাথের আহ্বান ছিল এরকমই। অন্ধকারেও আলোর সন্ধান পেয়েছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী ডেসমন্ড টুটু। যা কিছু জীর্ণ, জরাগ্রস্ত, সেসব এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াই মানুষের ধর্ম। আবহমান কাল ধরে মানবসভ্যতা এভাবেই অগ্রসর হয়েছে। এই প্রত্যাশা নিয়েই বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি এমন একটি দেশ যেখানে শান্তি বিরাজ করবে, ঘটবে না ধর্মান্ধতার অমানবিক প্রকাশ, থাকবে না হিংসা-বিদ্বেষ-হানাহানি।
নতুন বছরে জগতের আনন্দযজ্ঞে সবার ইতিবাচক আমন্ত্রণ ঘটুক। শাসক যারা, বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তা যারা, তাদের জনবান্ধব হয়ে উঠার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তাদের এই কথাটা মনে রাখতে হবে।
সম্পূর্ণ মানবিক মহিমায় নতুন বছরের যাত্রা শুরু হোক, সেই প্রত্যাশায়। নতুন বছরে খবরের কাগজের পাঠক, লেখক, এজেন্ট, হকার ও শুভানুধ্যায়ীদের নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। শুভ নববর্ষ।