নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ততটাই ভোটারদের মনে প্রভাব ফেলছে। কোন প্রার্থী যোগ্য বা কাকে ভোট দিলে দেশের সংকটকালীন অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব, সেসব বিষয় নিয়ে ভোটারদের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা ফল নির্ধারণে একটি বড় ফ্যাক্টর হবেন। এবার প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ভোটারের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়া এই বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই করে ভোট দেওয়ার মানসিকতায় রয়েছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, তরুণরা সাধারণ ভোটারের তুলনায় বেশি সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী। শিক্ষা আধুনিকীকরণ, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বিষয়গুলো তাদের ভোটের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। তরুণ ভোটাররা উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট অবস্থান নিচ্ছেন, যা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। শুধু তরুণ ভোটারই নন, এবার নির্বাচনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সামনে এসেছে। পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, মোট নিবন্ধিত ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩। তাদের মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ এবং পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪। এ হিসাবমতে, মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটার প্রায় ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। জামায়াতসহ ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। বিএনপি ১০ জন নারীকে প্রার্থী করেছে। এর বাইরে সিপিবি, বাসদসহ বাম দলগুলো কয়েকজন নারীকে প্রার্থী করেছে। এবারের নির্বাচনে নারী ভোটাররাও ফ্যাক্টর হবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রভাবশালী অনেক নেতা জেলে বা বিদেশে অবস্থান করছেন। তৃণমূল পর্যায়ের বহু নেতা-কর্মী এখন এলাকাছাড়া। তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সমর্থকরা দেশেই রয়েছেন। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের এসব সমর্থক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন। সারা দেশের সব দলের প্রার্থী আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে টানতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করছেন। নিরাপত্তা ও হামলা-মামলা থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন প্রতিপক্ষ দলের নেতারা।
নির্বাচনে শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য অবস্থানের কারণে নির্বাচনে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনকে একদিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। গণভোটের প্রচারের বিষয়ে সরকারের নির্দেশ এবং হ্যাঁ বা না ভোটের প্রচার না চালাতে ইসির নির্দেশনা রয়েছে। এ দুটি আদেশ পরস্পরবিরোধী। নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইংয়ের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যায়িত হওয়া উচিত ছিল। অনেক কর্মকর্তা বলছেন, গত তিন নির্বাচনের কর্মচারীরা প্রভাব বিস্তার করেছেন- এ অজুহাতে বর্তমান সরকার অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। আবার সরকারই কর্মচারীদের নির্বাচন ও গণভোটের প্রচার করতে বলছে। এ বিষয়গুলো প্রশাসনের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভোটাররা মনে করছেন, সরকারের নির্দেশনায় প্রশাসন একটি পক্ষাবলম্বন করে নিজেদের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোকেও ভোটারদের মন জয় করতে দিতে হচ্ছে নানামুখী প্রতিশ্রুতি। ভোটাররাও বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যোগ্য প্রার্থীকে দেশ পরিচালনায় অগ্রভাগে নিয়ে আসতে কিছুটা কৌশলী ভূমিকা নিচ্ছেন। একটি জটিল নির্বাচনি সমীকরণ মাথায় রেখে প্রার্থীরা আগামীর বাংলাদেশ গড়তে ভোটারের মুখোমুখি হচ্ছেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ এবং জনপ্রতিনিধির মুখোমুখি অবস্থান বা পারস্পরিক সম্পর্ক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ উপজীব্য হয়ে ওঠে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের জনগণ ও জনপ্রতিনিধি আজ মুখোমুখি। এখন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সবার সুষ্ঠু সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতা কাম্য। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বাচনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দেবে, সেটাই প্রত্যাশা।