আমাদের জাতিগত সংগ্রাম ও অর্জনের অন্যতম স্বর্ণস্তম্ভ একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটির স্বীকৃতি আমাদের আত্মগৌরবকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছে। মানবীয় বৈশিষ্ট্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে ভাষা। ব্যক্তিক বিকাশ থেকে বৈশ্বিক জানালার মুক্তপথেই বিশ্বকে আপন করে নেয় মানুষ। জাতিগত ও বৈশ্বিক- সব দিক থেকে দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।
ব্রিটিশ উপনিবেশ-উত্তর পাকিস্তানে আমাদের পূর্বসূরিদের প্রত্যাশা ছিল ভাষা-সংস্কৃতির ভিত্তিতে তারা আত্মপ্রতিষ্ঠার অবাধ সুযোগ পাবেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরুতে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে ‘একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে স্ফুলিঙ্গের সূচনা করেন। ভাষার জন্য আত্মদানের দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। তবে এই আত্মদান শুধু ভাষার জন্য ছিল না। ছিল বাঙালি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও অর্জন। একুশে ফেব্রুয়ারি তাই শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন নয়; বাঙালি জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।
একুশে ফেব্রুয়ারি এভাবেই আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে। যুক্ত হয়ে গেছে আমাদের সৃজনশীলতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক চর্চা ও বিকাশের সঙ্গে। এ মাসে ঢাকায় বাংলা একাডেমি যে বইমেলার আয়োজন করে, সেই মেলার লক্ষ্য থাকে আমাদের সামগ্রিক জাতীয় সৃজন ও জ্ঞানের সমাহার ঘটিয়ে জাতিগত অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখা। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে একুশে ফেব্রুয়ারির দিনটি ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে উদযাপিত হয়। দেশের বহু জায়গায় বইমেলার আয়োজন থাকে। জাতীয় শোক, গৌরব ও অর্জনের উৎস হচ্ছে তার স্মৃতি। একুশের আত্মাহুতি, সংগ্রাম ও অর্জনের স্মৃতি আমাদের সেই গৌরবকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। উজ্জীবিত করে। বাঙালি হিসেবে আমরা গর্ববোধ করি। বাঙালিরাই বিশ্বের প্রথম জনগোষ্ঠী, যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’– আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত গানটি সেই গৌরবময় স্মৃতিকে আজও ভাস্বর করে রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বিশ্ব-ইতিহাসে দিনটি তাই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
চর্চার অভাবে ভাষার মৃত্যু হয়। ভাষা-গবেষকরা বলছেন, প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে কোনো-না-কোনো ভাষার মৃত্যু হচ্ছে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে সেই ভাষাগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। আমাদের বাংলা ভাষা নিয়েও মাঝে মাঝে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান আমলে উর্দু-আরবিঘেঁষা ভাষাচর্চার কথা বলে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহকে ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুনীর চৌধুরীর মতো সারস্বত ব্যক্তিবর্গের কারণে সেই চেষ্টা সফল হয়নি।
সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এ ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। আমাদের মুখে ব্যবহৃত হয় না এমন অনেক শব্দ মিছিল-মিটিংয়ে উচ্চারিত হয়েছে। ওই সব শব্দ শুধু শব্দ নয়, একধরনের বিজাতীয় খণ্ডিত সংস্কৃতিকে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাষাবিদরা বলেন, ভাষা জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক গতিতে এগোয়। বাইরে থেকে শব্দ, বাক্য বা বাক্যাংশ ঢুকিয়ে দিয়ে ভাষাকে বদলে ফেলা যায় না। অথচ সেই চেষ্টাই করেছেন চব্বিশের আন্দোলনে অংশ নেওয়া একশ্রেণির মানুষ। তাদের লক্ষ্য ছিল ভাষার পথ ধরে বাঙালি সংস্কৃতিকে বদলে ফেলা। বায়ান্ন সালে বাংলার স্থানে উর্দুকে প্রতিস্থাপিত করে ভাষা ও সংস্কৃতিকে বদলে ফেলার চেষ্টা হয়েছে, আর এবার হয়েছে বিজাতীয় শব্দ ব্যবহার করে।
কৃত্রিম ভাষা-বিচ্যুতির মাধ্যমে সংস্কৃতিকে বদলে ফেলার এই চেষ্টার বিরুদ্ধে সবার সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। আমাদের পাঠক থেকে শুরু করে সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, বাঙালি সংস্কৃতিকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা হলে তাকে যেন পৃষ্ঠপোষকতা করা না হয়। ভাষা ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা স্বাভাবিক গতিতে চলে, সেভাবেই যেন চলতে দেওয়া হয়। মাত্র ৯ দিন আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর নতুন করে আমাদের জাতিগত যাত্রা শুরু হয়েছে। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বহন করছে। এই সরকারের সময় দেশের সংস্কৃতি ও ভাষাচর্চা একুশের ধারায় ফিরে আসবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি।