নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপর কৃষকদের স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্তটি হলো, ১২ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিয়েছে। নিকট অতীতে কৃষকদের কল্যাণে দেশব্যাপী এত বড় সিদ্ধান্ত কোনো সরকারকে নিতে দেখা যায়নি। এই সিদ্ধান্ত, আমাদের কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুদসহ কৃষকদের কাছে পাওনা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা এ মওকুফের আওতাভুক্ত হবে।
জনগণের রায় নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের ১০ দিনের মাথায় গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত নিল। বিএনপি নির্বাচনি ইশতেহারেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সরকার গঠন করতে পারলে তারা এই কৃষিঋণ মওকুফ করে দেবে। নির্বাচনি ইশতেহারের সেই প্রতিশ্রুতি সরকার রক্ষা করল। এটি যে বার্তা দেয় তা হলো, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিএনপি সরকার আন্তরিক এবং আরও যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা নতুন সরকার পূরণ করবে।
কৃষিঋণ মওকুফের সুফল সরাসরি কৃষকরা পাবেন। সেইসঙ্গে দেশের কৃষিক্ষেত্রে গতির সঞ্চার হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব উল্লেখ করেছেন, কৃষি খাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে সরকার এই ঋণ মওকুফ করেছে। ১২ লাখ কৃষক এতে প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হবেন। ছোট অঙ্কের ঋণ বলে এই ঋণ নিয়েছিল মূলত দরিদ্র প্রান্তিক কৃষক। তাদের কাছে ছোট অঙ্কের ঋণও বড় বোঝার মতো হয়ে ওঠে। ঋণ মওকুফের ফলে তারাই উপকৃত হবেন। ঋণের কিস্তি বাবদ যে অর্থ কৃষক ব্যয় করতেন, সেই অর্থ এখন তারা উন্নতমানের বীজ বা আধুনিক সেচ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। মাথার ওপর ঋণের বোঝা না থাকায় তাদের কর্মস্পৃহা বাড়বে, যা সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাবে। পরিণামে লাভবান হবে দেশ।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে এখনো মহাজনি প্রথা রয়ে গেছে। কিছু দিন আগে এ রকম একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ভিডিওতে মহাজনি প্রথা বিলুপ্তির জন্য মহাজনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ঋণচুক্তির দলিল কয়েকজন পুড়িয়ে দিচ্ছিল। সরকারের মুখপাত্র হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সেই দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছেন, স্থানীয় মহাজনি ঋণের উচ্চসুদের হাত থেকে এই উদ্যোগ ক্ষুদ্র কৃষকদের রক্ষা করবে। এর প্রভাবে গ্রামীণ মূল্যস্ফীতিও কমবে। ঋণে জর্জরিত অনেক কৃষককে দেখা যায়, মহাজনের নির্যাতনে কাজের সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসেন। তাদের শিকড়চ্যুতি ঘটে, পরিবার-পরিজন বিপর্যয়ের শিকার হন আর দারিদ্র্য বাড়ে। এই ঋণ মওকুফের ফলে সেই অভিবাসনের শঙ্কা কমবে। এতে বড় বড় শহর, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার ওপর যে চাপ পড়ে, তার কিছুটা হলেও লাঘব হবে। দারিদ্র্য নিরসনেও সাহায্য করবে।
দেশের কল্যাণের দিকে সবসময় জনমুখী সরকারের লক্ষ্য থাকে। বর্তমান সরকার সে রকমই একটা পদক্ষেপ গ্রহণ করল। এটি দেশের অর্থনীতিতে যেমন অবদান রাখবে, তেমনি সরকার সম্পর্কে জন-আস্থা তৈরি করবে। আমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই।