সরকারি অফিস-আদালতে অনিয়মের শেষ নেই। দীর্ঘকাল ধরে বিষয়টি আলোচনা-সমালোচনায় রয়ে গেছে। সরকার এসেছে আর গেছে, কিন্তু এতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশের দাপ্তরিক ক্ষেত্রে এই অনিয়মই যেন নিয়ম হয়ে উঠেছে। সুশাসনের শর্ত হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে যেসব অনিয়মের নিগড়ে অফিস-আদালতগুলো বাঁধা পড়ে আছে, তা থেকে মুক্তি পাওয়াও জরুরি। বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে দুটি অভিযোগ প্রায় সবার মুখে মুখে চর্চা হয়। এর একটি হচ্ছে দুর্নীতি, আরেকটি অফিসের নিয়ম মেনে না চলা।
বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার দেশ শাসন করছে। নতুন সরকার নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করে নির্বাচিত হয়ে এই শাসনক্ষমতা পেয়েছে। দলটির দেওয়া প্রতিশ্রুতির একটি ছিল সরকারিভাবে মানুষকে সর্বোচ্চ সেবা দানের বিষয়টি নিশ্চিত করা। সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসাধারণকে এই সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্য প্রার্থীরা। দল হিসেবে বিএনপি অবিস্মরণীয় জয় পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায় রয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকারের।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিয়মিত সচিবালয়ে অফিস করছেন। তিনি সকাল নয়টার দিকে সচিবালয়ের অফিসে চলে এসে কাজ শুরু করেন। এতে সচিবালয়ের দাপ্তরিক পরিবেশও বদলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী একজন সাধারণ কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মতো যখন অফিসে আসেন, তখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিব থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত অফিসে আসা ছাড়া উপায় থাকে না। এতে সচিবালয়ে কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। কিন্তু দীর্ঘকালের অফিস-সংস্কৃতি সহজে বদলে যাবে, তেমনটা হবার কথা নয়। অথচ এটাই নিময়–যথাসময়ে অফিসে আসা ও কাজ করা। জনসাধারণকে সেবা দেওয়া।
দীর্ঘকালের অফিস-সংস্কৃতি যে এখনও বহাল রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিস সরেজমিনে পরিদর্শন করে সেই অভিজ্ঞতারই মুখোমুখি হয়েছেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী কায়সার কামাল। ঘটনাটি ঘটে গত বুধবার। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে অফিস শুরুর মুহূর্তে সকালে হঠাৎ ওই ভূমি অফিসে হাজির হন ভূমি প্রতিমন্ত্রী। প্রতিমন্ত্রী আসার খবরে সাড়া পড়ে যায় সেবাগ্রহীতা মধ্যে। সেবাগ্রহীতারা প্রতিমন্ত্রীর কাছে তিন ধরনের অভিযোগ তুলে ধরেন। এগুলো হচ্ছে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথাসময়ে অফিসে আসেন না; ঘুষ-দুর্নীতি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে আর এতেই মানুষকে শিকার হতে হয় নানা ভোগান্তির। প্রতিমন্ত্রী বসে আছেন আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এলেন প্রায় একঘণ্টা পরে, তাও প্রতিমন্ত্রী দপ্তরের বারান্দায় বসে আছেন এখবর জানার পরে তারা তড়িঘড়ি করে অফিসে আসেন। এই বিলম্ব এবং ঘুষ লেনদেনের কারণে প্রতিমন্ত্রী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে বলেছেন মানুষকে তাদের প্রাপ্য সেবা দিতে হবে, কোনোরকম গাফিলতি বা হয়রানি করা যাবে না।
প্রতিমন্ত্রীর এই উদ্যোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত অফিস করা আমাদের একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। বার্তাটাা হলো, এতদিন ধরে আমাদের অফিস-আদালত যেভাবে চলছে, সেভাবে চলতে পারবে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে এবং মানুষকে তার প্রাপ্য সেবা দিতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতির যে আখড়া হয়ে উঠেছে কোনো কোনো অফিস বা সেবাদাতা সরকারি প্রতিষ্ঠানে, তাও বন্ধ করতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটতে পারবে না।
বার্তাটি জনগণকে যে স্বস্তি দিচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দুর্নীতি, অনিয়ম, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করার যে সংস্কৃতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, বর্তমান সরকার সেসবের মূলোৎপাটন চাইছে। আমরা সরকারের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ দেই। সেই সঙ্গে সরকারি অফিস-আদালত-হাসপাতাল-থানা ও সেবাপ্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন–প্রতিষ্ঠানটি যত বড় হোক বা ছোট–আশা করব তারা নিয়ম মেনে অফিস করবেন, কাজ করবেন। মানুষের সেবা নিশ্চিত করবেন। তাদের মনে রাখতে হবে, মানুষের করের টাকায় আপনাদের গ্রাসাচ্ছাদন হয়, জীবিকা নির্বাহ করেন। এতদিন যা-ই ঘটে থাকুক, মানুষের সেবাই হোক আপনাদের ব্রত। সরকার প্রধানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করুন। মানুষকে স্বস্তি দিন।