ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবেশ করেছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনটি এ জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকারের কাছে জনপ্রত্যাশাও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এ সরকারের দেশ পরিচালনায় কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে, সে বিষয়গুলো আমলে নিয়ে এগোতে হবে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এ সংসদে জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন প্রশ্নে বিতর্ক উত্তাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। দেশের একটি নতুন বাস্তবতায় শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আস্থা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে সংসদে সরকারি দল, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে। আমরা আশা করব, এ সংসদে গণতান্ত্রিক চর্চা, গঠনমূলক বিতর্ক, কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ জাতীয় সংসদ প্রতিষ্ঠিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আজ থেকে দেশে কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু। সংসদ হবে সব যুক্তিতর্ক ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্র। আইন অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে প্রথম অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসাবে গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। তিনি সংসদের স্পিকার নির্বাচন ও অধিবেশন পরিচালনার জন্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন। সে প্রস্তাব সংসদ সদস্যরা সমর্থন করলে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্পিকারের আসনে বসেন এবং অধিবেশন পরিচালনা শুরু করেন। রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিয়েছেন নতুন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হয়েছেন আহমেদ আজম খান।
সংসদে জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদদের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর আগে জুলাই অভ্যুত্থানের ওপর সংসদ সদস্যরা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান এগুলো উপস্থাপন করেন। দুপুরে নামাজের বিরতির পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ভাষণ দিতে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করলে জামায়াত ও এনসিপির দলীয় সদস্যরা প্রতিবাদ জানিয়ে স্লোগান দেন। প্রতিবাদের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হয়। এ সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বিগত সরকারকে ফ্যাসিস্ট ও দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন উল্লেখ করে বলেছেন, হাজারও শহিদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের সূচনা হয়। স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিবাহিত হলেও আমরা দুঃখজনকভাবে লক্ষ করেছি, গণতন্ত্রকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো যায়নি। বিগত বেশ কয়েকটি সংসদই গঠিত হয়েছিল একতরফা বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক দলগুলোর এ ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত দেশকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পথে নিয়ে যায়। সাধারণ মানুষ এখন আর এ ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন দেখতে চায় না। জনগণের কাঙ্ক্ষিত চাওয়া সঠিকভাবে দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটুক। সে বিবেচনায় বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রত্যেক সদস্যের কাছে দেশ ও জাতির জন্য দায়িত্ব বহু গুণ। সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। অহেতুক তর্ক-বিতর্কে না জড়িয়ে দেশ ও জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখে জাতীয় সংসদকে প্রাণবন্ত রাজনীতির কেন্দ্র করে তুলতে হবে। প্রত্যাশা করছি, একটি প্রতিষ্ঠিত কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাবে দেশ।