ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় এ পর্যন্ত চার শতাধিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর ফলে হাজারও মধ্যপ্রাচ্যগামী বাংলাদেশি কর্মীর স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী যায় সৌদি আরবে। ফ্লাইট অনিয়মিত হয়ে পড়ায় প্রবাসীরা ঝুঁকিতে আছেন, তাদের কাজ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকে ছুটিতে দেশে এসেও আটকা পড়েছেন। অনেক কর্মীর ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা খরচ করে স্বপ্ন পূরণের খুব কাছাকাছি এসেও শেষরক্ষা হয়নি। ইতোমধ্যে এসব কর্মীর অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। অনেক নতুন কর্মী যেতে পারছেন না। সব মিলিয়ে দেশের জনশক্তি রপ্তানি ক্ষতির মুখে পড়েছে। অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত সৌদি আরবকেন্দ্রিক শ্রমবাজার হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে এখন বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিকল্প বাজার না থাকায় কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, এতে করে অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারের শঙ্কা বাড়ছে। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমানে আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেকেই বিদেশে যেতে ঋণ করেন। তারা এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেতে না পারায় ঋণের টাকাও শোধ করতে পারবেন না। এতে করে ভুক্তভোগীর পরিবার উল্টো চাপে থাকবে। তাই ঋণগ্রস্ত পরিবারকেও সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা করা জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে গত বছরের তুলনায় এই সময়ে কাজের জন্য বিদেশ যাওয়া কমেছে। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশে যেতে ছাড়পত্র নেওয়া কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। বিএমইটি বলছে, গত মাসেও বিভিন্ন দেশে গেছেন ৬৫ হাজার ৬১৩ জন। এর মধ্যে প্রথম ১০ দিনে গেছেন প্রায় ৩৮ হাজার কর্মী। ১ থেকে ১০ মার্চ পর্যন্ত বিদেশ যেতে ছাড়পত্র নেন ২১ হাজার ১২২ জন। গত বছর একই সময়ে ছাড়পত্র নেন ৪৬ হাজার ৭৪৪ জন। যুদ্ধের প্রভাবের কারণে এটি কমে অর্ধেকে নেমেছে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে।
এদিকে বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন শত শত কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে যেতে না পেরে বিমানবন্দরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যুদ্ধ কবে থামবে, তা নিশ্চিত না হলে ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর ব্যাপারে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেবে না। এ ছাড়া সৌদি আরবের ঢাকার দূতাবাসও ১০ দিনের জন্য ঈদের ছুটি হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে অনেক ক্ষতির মুখে রয়েছেন জনশক্তি রপ্তানিকারকরা। প্রতি ঈদে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রবাসী দেশে আসেন। এতে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়ে অর্থনীতি অনেকটা চাঙা হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এবার রেমিট্যান্সেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের জনশক্তি রপ্তানি। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। রাশিয়া, জাপান, ইউরোপসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে।
এসব নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণে সরকারকে কাজ করতে হবে। দক্ষ কর্মী গড়ে তোলায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা আশা করছি, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রদূতরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবেন।