সামনে ঈদ। ঈদে যাদের শিকড় গ্রামে বা মফস্বল শহরে, তারা বাড়িমুখী হন। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেন। ঈদ পরিণত হয় অপার আনন্দ উৎসবে। এবারও ঈদযাত্রা শুরু হয়ে গেছে। মানুষ গ্রামের বাড়িতে ছুটছেন। কিন্তু তাদের যাত্রা শুরুতেই ভালো হচ্ছে না। খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীর কমলাপুর ও সদরঘাটে ভিড়। সড়কপথেও মানুষ বাড়ির দিকে ছুটছেন। কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাড়ায় চলছে নৈরাজ্য।
ঘরমুখী মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করার দায়িত্ব সরকারের। এই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গত শনিবার রাজধানীর সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সরকার কাজ করছে। পর্যাপ্ত জ্বালানিও নিশ্চিত করা হয়েছে, নির্ধারিত ভাড়াই নেওয়া হচ্ছে।
ভাড়া প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তার সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। অনলাইনে ও সশরীরে বাসের টিকিট বিক্রিতে দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে এসি বাসগুলোতে মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। অনলাইন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা-বুড়িমারী রুটে বরকত ট্রাভেলসের এসি স্লিপার বাসের গত ১০ মার্চের ১ হাজার ৫০০ টাকার ভাড়া ১৮ মার্চের ট্রিপে ধরা হয়েছে ৩ হাজার টাকা। একইভাবে ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে এভারগ্রিন ট্রান্সপোর্টের ভাড়া ১ হাজার ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করা হয়েছে। এ রকম ভাড়া বৃদ্ধি অযৌক্তিক। যাত্রীরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আসলে যাত্রীদের বাস মালিক কর্তৃপক্ষ জিম্মি করে ফেলেছে। যেহেতু এটা ঈদ আনন্দযাত্রা, মানুষ বাড়ি যেতে মরিয়া, ফলে মালিকপক্ষের সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক হলেও যাত্রীরা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মন্ত্রী যদিও বলেছেন ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই, তবে বাস্তবটা এটাই–ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে।
নন-এসি বাসের ভাড়া সুনির্দিষ্ট করা রয়েছে। সেই ভাড়া কেউ বাড়াতে পারে না, বাড়ায়ও না। কিন্তু এসি বাসের ভাড়া প্রতিটি কোম্পানি স্বতন্ত্রভাবে নির্ধারণ করে, যা তদারকি করা মালিক সমিতির পক্ষে কঠিন। শুভঙ্করের ফাঁকিটা এখানেই। যত কারসাজি এই এসি বাসের ভাড়াকে কেন্দ্র করেই হচ্ছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ তো দূরের কথা, বাসমালিকরাই এই ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে চান না বা করেন না। তাদের কাছে টু পাইস কামানোর মওকা যেন এই ঈদ। সরকারকে এদিকেই নজর দিতে হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী মন্ত্রী বলেছেন, ভাড়ার ক্ষেত্রে নৈরাজ্য হলে তিনি দেখবেন। তার ভাষায়, ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তার। ঈদে মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে। এখনই সেই দায়িত্ব তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করছি। নন-এসি বাস ভাড়ার মতো এসি বাসের ভাড়াও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হোক।
জ্বালানি সরবরাহে কিছুটা অনিশ্চয়তা আছে। জ্বালানি তেলের দাম এখনো বাড়েনি। তাই ভাড়া বাড়ানোরও সুযোগ নেই।
আগামী ১৭ মার্চ থেকে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি শুরু হচ্ছে। ফলে ১৬ মার্চের বিকেল থেকেই রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালগুলোতে মানুষের ঢল নামবে। সামনের দিনগুলোতে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য বেশি দেখা দেবে, এ রকম শঙ্কা থেকেই যায়। এর মধ্যে স্বস্তির খবর হচ্ছে, লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে না। লঞ্চে মানুষের উপচে পড়া ভিড়।
ঘরমুখী মানুষের এই ঈদযাত্রা যাতে নির্বিঘ্ন হয়, সে বিষয়ে সরকারকে আরও সতর্ক এবং কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। অতিরিক্ত অযৌক্তিক ভাড়া নেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীকে তা বিবেচনায় নিয়ে বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। সড়কপথে যানজট যাতে সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। রেলযাত্রা এখনো বিলম্বিত না হলেও আগামীতে বিলম্বিত হতে পারে। এটিও যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে তৎপর থাকবে সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়। সড়ক, লঞ্চ ও রেল দুর্ঘটনা যাতে একেবারেই না ঘটে, সে ব্যাপারে সড়ক ও পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ বাসমালিক ও চালকদের সচেতন থাকা জরুরি। বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ গুরুত্ব দেবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। ঘরমুখী মানুষের আনন্দযাত্রা নিরাপদ হোক, আনন্দদায়ক হোক।