বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবন তার অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য হারাতে বসেছে কিছু বনদস্যু ও মহাজনের কারণে। এখানে বনজীবীরা বনদস্যু ও মহাজনদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। এ অঞ্চলের মানুষ গহিন অরণ্যে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুন্দরবনে আবারও দস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী বনজীবীরা। বনদস্যুদের চাঁদা পরিশোধ না করলে জীবিকা নির্বাহ করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। খবরের কাগজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলেরা মহাজনদের কাছ থেকে বিশেষ নম্বরের একটি পাঁচ টাকার নোট নিয়ে অরণ্যে প্রবেশ করেন। দস্যুরা নৌকা থামিয়ে ওই নোট নম্বর তাদের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। যাদের কাছে টোকেন থাকে না, তাদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কোম্পানির মহাজনরা দস্যুদের আগাম টাকা দিয়ে জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, যা জেলেদের ঋণের জালে আটকে ফেলে। অভিযোগ রয়েছে, এর নেপথ্যে বন বিভাগের ভেতরে কিছু অসাধু লোক, দালাল চক্র এবং ছদ্মবেশী কিছু ব্যক্তির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। দস্যু আর কিছু মহাজন এখন এক হয়ে সাধারণ জেলেদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, বনের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এখন আর স্থানীয় প্রশাসনের হাতে নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় সুন্দরবন তার অতীত গৌরব হারিয়ে ফেলবে।
সুন্দরবনের দস্যুদের নৃশংসতার ইতিহাস একদিনের নয়। এখানে বনদস্যুদের নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে খবরের কাগজের সরেজমিন প্রতিবেদনে। অপহরণ আর নির্যাতনের ভয়াবহতা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন বহু বনজীবী। অনেকেই পরিবার নিয়ে প্রায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। সুন্দরবনের প্রান্তিক বনজীবীদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তার অভাবই এ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। বন বিভাগ থেকে মাছ, কাঁকড়া ধরার অনুমতি বা পাস দেওয়ার প্রক্রিয়াটি চালু থাকলেও সেখানে দালালদের আধিক্য অনেক বেশি। সাধারণ জেলেরা সরাসরি বন অফিসের সেবা নিতে গিয়ে প্রায়ই বাধার মুখে পড়েন, ফলে তারা দালাল চক্রের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দালালরা একদিকে জেলেদের কাছ থেকে বাড়তি অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে জেলেদের অবস্থান ও যাতায়াতের গোপনীয় তথ্য দস্যুদের কাছে পাচার করছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া খবরের কাগজের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দস্যু ও তাদের সহযোগীদের ‘ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কালো তালিকার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। দস্যুরা একটি তালিকা রক্ষণাবেক্ষণ করে, যেখানে গণমাধ্যমে মুখ খোলা বা প্রশাসনের দস্যুবিরোধী তথ্য দেওয়া জেলেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ তালিকার ভয়ে জেলেরা প্রথমে মুঠোফোনে, এমনকি সরাসরি দেখা করে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের অভিযোগ, উপকূলের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ দস্যুদের সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। সেখানে প্রাণের ভয়ে এখনো পা রাখতে পারছেন না সাধারণ বনজীবীরা।
বন বিভাগ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ধাপে ধাপে সুন্দরবন অঞ্চলের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র, ২২ হাজার ৫০৪টি গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিল। পরে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রাণবৈচিত্র্যে ভরা সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। সরকারি নথিতে এ অর্জনকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মৎস্য ও পর্যটন খাতের জন্য এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি সে নথিবদ্ধ সাফল্যের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার কোনো মিল নেই। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হওয়ার সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ৭ বছর না যেতেই বনের নিয়ন্ত্রণ এখন চলে গেছে নতুন এক দস্যু সিন্ডিকেটের হাতে।
বনজীবীরা বংশপরম্পরায় সুন্দরবনকে ঘিরে জীবন ও জীবিকার তাগিদে পেশা হিসেবে মধু সংগ্রহ, মৎস্য আহরণ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু কিছু বনদস্যু ও মহাজনের কারণে তাদের এ পৈতৃক পেশা সংকটের মুখে। তাদের জীবনধারণের অধিকারের ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। এটা মৌলিক ও মানবাধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘনও বটে। তাই সুন্দরবন উপকূলীয় বনজীবীদের জানমালের নিরাপত্তা ও জীবন ধারণের অধিকার নিশ্চিতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে শক্ত হাতে সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় রাখতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন যাতে কোনোভাবেই বনদস্যু ও মহাজনদের সঙ্গে আঁতাত করে বনজীবীদের বিপদের কারণ না হয়, সেদিকটা কঠোরভাবে খেয়াল রাখতে হবে। আশা করছি, সরকার একটি সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সুন্দরবনের বনজীবীদের রক্ষায় দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।