আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এর আগে বাংলাদেশ ছিল উত্তাল। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে যখন বিদ্রোহ দমনের নামে বাঙালি নিধনযজ্ঞে নামে, বঙ্গবন্ধু তখনই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। বেতার বার্তার মাধ্যমে সারা দেশে সেই ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের চূড়ান্ত লড়াই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষ হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। পুরো বাংলাদেশ হয়ে ওঠে রণাঙ্গন। স্বাধীনতার জন্য ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
সেই প্রথম, এই ভূখণ্ডের মানুষ স্বাধীনতা অর্জন করে। সেই ইতিহাস যেমন রক্তপাতের, তেমনি আত্মগৌরবের। স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চ এলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছিল অনেক দীর্ঘ। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির অব্যবহিত পর পঞ্চাশের ভাষা আন্দোলন, ষাটের স্বাধিকার আন্দোলন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের পথ পেরিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চে আসে স্বাধীনতার ঘোষণা। কিন্তু ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। এ জন্য বাঙালিদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। পাকিস্তানি শাসকরা এই ভূখণ্ডকে সামরিকভাবে দখল করে রাখে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের মধ্যে বিদ্রোহের যে সূচনা ঘটেছিল, তা অস্ত্রের জোরে নির্মূল করার চেষ্টা করে। কিন্তু অকুতোভয় বাঙালি সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাজিত করে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার লাল সূর্য। আজকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি তাদের প্রতি যারা স্বাধীনতার জন্য শহিদ হয়েছিলেন। স্বাধীনতা কথার কথা ছিল না। বাঙালির লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি শাসন-শোষণের হাত থেকে মুক্ত হওয়া। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই রাষ্ট্রে প্রত্যেক মানুষের অধিকার নিশ্চিত থাকবে। কেউ শোষণের শিকার হবে না। ধর্মের নামে নির্যাতিত বঞ্চিত হবে না। সবার বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত থাকবে।
বাংলাদেশ আজ ৫৬তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে। কিন্তু এখনো সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। মব-সন্ত্রাস থেকে শুরু করে যত ধরনের নৈরাজ্য রয়েছে, তার নগ্ন রূপ আমরা লক্ষ করেছি। রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা বলতে কিছুই ছিল না। সরকার দেশকে ক্রমশ দক্ষিণ পন্থার দিকে নিয়ে গেছে। যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সব ধরনের স্মারক, স্মৃতিচিহ্ন, স্থাপনা; হয় মুছে ফেলা হয়েছে অথবা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলা করা হয়েছে বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবাহী সব স্থাপনা বা ভাস্কর্যের ওপর।
এই ধারাতেই বেড়েছে সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক হানাহানি, শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্য, মূল্যবোধের অবক্ষয়, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো মারাত্মক ঘটনা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে মবকে ‘প্রেসার গ্রুপ’ বলে উৎসাহিত করা হয়। এতে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটে। এর জের এখনো চলছে।
স্বাধীনতার লক্ষ্য হিসেবে যে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলা হয়েছিল, গত ৫০ বছরে সেই মুক্তির পথে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও গত ১৫ মাসে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশে কোনো বিনিয়োগ ছিল না, কর্মসংস্থান হয়নি। এক পরিসংখ্যানে বলা হচ্ছে, এখন দেশের এক-চতুর্থাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। বেড়েছে হতদরিদ্রের সংখ্যা। মূল্যস্ফীতি কমানোর কথা বলা হলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেটা কমাতেও ব্যর্থ হয়। সাধারণ মানুষের তাই বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছে।
আশার কথা, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এসেছে। এই সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী। এদিকে পুঞ্জীভূত সমস্যার পাহাড়। সরকার এর মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছে। সরকারপ্রধান শুরু থেকেই মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু যেতে হবে অনেক দূর। প্রথম কাজ হবে রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা। এরপর দৃষ্টি দিতে হবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ওপর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, অর্থনীতিকে গতিশীল করতে হবে। স্বাধীনতার মূল চেতনাকে রক্ষা করা হলে এর সবই অর্জন সম্ভব বলে আমরা মনে করি। দেশ সেই ধারাতেই এগিয়ে যাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।