দেশে হঠাৎ করেই বাড়ছে হামের প্রকোপ। হাসপাতালে রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। চাপ সামলাতে রোগীদের পাঠানো হচ্ছে ডিএনসিসি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে। এদিকে অন্তত ১০টি জেলায় হাম রোগ উদ্বেগজনক হারে সংক্রমিত হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ১২ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। রাজশাহী অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে সংক্রামক রোগ হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের নমুনা পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য হারে এ রোগ শনাক্ত হচ্ছে। তবে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় আইসোলেশন ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধার অভাবে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তথ্য মতে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সেবা না পেয়ে ১৫ দিনে মোট ৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টিকা সংকট দূর না করা এবং বিভিন্ন দাবিতে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলন। চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি, কথা বলা কিংবা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর জটিলতায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখ ও মস্তিষ্কে প্রদাহসহ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সংক্রামক রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থায় রাখার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের অন্য রোগীদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে। শিশুদের স্বজনরা জানিয়েছেন, আইসিইউতে নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সিরিয়ালে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে হামের প্রাদুর্ভাব আরও বাড়বে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিল। ২০২৪ সালে সতর্ক করে বলা হয়, এখনই পদক্ষেপ না নিলে বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশ হামের প্রাদুর্ভাবের উচ্চ বা খুব উচ্চ ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ হিসেবে বলছে, ২০২০ সালের করোনা মহামারি শুরু হওয়ার পর প্রথম দুই বছর বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শিশুদের হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের টিকাদান কর্মসূচি থেমে গিয়েছিল। বর্তমানে বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাবের যে উচ্চ ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে তার প্রধান কারণ এটিই।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে টিকা কেনার জন্য ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র হাসপাতাল প্রস্তুত, আইসি ইউ ও ভেন্টিলেটর বাড়ানো এবং বিশেষ ঠিকাদান কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো হামে আক্রান্ত ব্যক্তি ১৩ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এ ছাড়া ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও এ রোগের সংক্রমণ বাড়ছে, যাদের এখনো টিকা দেওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আক্রান্ত এলাকায় ব্যাপক পুনঃটিকাদান কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। ইপিআই কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুকে ৯ মাস বয়সে প্রথম হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। দ্রুত বেশি সংক্রমণ এলাকা ঘিরে টিকা দিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা। তারা অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন শিশুকে নির্ধারিত সময়ে টিকা দেওয়া এবং কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার।
দেশজুড়ে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেহেতু এটি অধিক ছোঁয়াচে রোগ, সে ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র হাসপাতাল প্রস্তুত, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। সংক্রমণ যাতে বেশি ছড়াতে না পারে সেজন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে টিকা দান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগের জনবল সংকট দূর করতে হবে। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই মাঠপর্যায়ের কঠোর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। প্রত্যাশা করছি, সরকার সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সংক্রামক রোগ হাম থেকে শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।