দেশে যে জ্বালানিসংকট চলমান রয়েছে, তার দ্রুত সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের তৎপরতা থেকে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, সরকার নানাভাবে চেষ্টা করছে নানা উৎস থেকে জ্বালানি তেল কেনার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিকল্প উৎস থেকে সরকার জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে।
দেশের জ্বালানি পরিস্থিতিও ভালো নয়। সরকার বলছে, দেশে জ্বালানিসংকট নেই, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ফিলিং স্টেশনে চালকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। চাহিদামতো তেল মিলছে না। তেল নিয়ে মজুতদারি ও কালোবাজারি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। জ্বালানিসংকটের প্রভাব পড়েছে নানা ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যান চলাচলে সংকট বাড়ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাক্ষেত্রে স্থবিরতা তৈরির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের অভাবে যদি বাস-গাড়ি চলতে না পারে, তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী ক্লাস নেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি রাজধানীতে স্কুল চলাকালীন যানজট নিরসনে শিক্ষামন্ত্রীকে বিকল্প খুঁজতে বলেছেন। গত পরশু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী এবং গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সাক্ষাৎ করতে গেলে কীভাবে স্কুলের সময়ে যানজট নিরসন করা যায় এবং এর বিকল্প ব্যবস্থা কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব তৈরি করে উপস্থাপন করতে বলেছেন।
একদিকে যানজট, অন্যদিকে জ্বালানির অভাবে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সব স্কুলে তিন দিন অনলাইনে আর তিন দিন সশরীরে পাঠ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করছে সরকার। গত পরশু সচিবালয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জ্বালানিসংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি (হামজনিত) এবং নগরীর তীব্র যানজট পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এই উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, সংকট যা-ই হোক, সরকারের মূল লক্ষ্য শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা। এ জন্যই অনলাইন-অফলাইনের সমন্বয়ে পাঠদান চালু রাখার বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা করছে।
একদিকে জ্বালানিসংকট, অন্যদিকে যানজট–এই উভয়সংকট মোকাবিলায় সরকার যে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছে, তা সমর্থনযোগ্য। আমাদের স্মরণে আছে, করোনাকালেও জরুরি ভিত্তিতে এ ধরনের ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হয়েছিল। সে সময় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম অনেক দিন অনলাইনে চালু ছিল। তবে তাতে নানা সমস্যাও দেখা দিয়েছে। অভিভাবক ও শিক্ষকরা লক্ষ করেছেন, শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই আসক্তির প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এবার তাই অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হলে আবার যাতে শিক্ষার্থীরা ইন্টারনেটে আসক্ত না হয়ে পড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে। কারিকুলামে এমন কিছু থাকতে হবে, যাতে এই আসক্তি থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখা যায়। আমরা আশা করছি, এই ব্যবস্থা হবে সাময়িক। সংকট দূর হয়ে গেলে স্কুলগুলো আবার প্রচলিত ব্যবস্থায় ফিরবে।
সরকারপ্রধান যানজট নিরসনের যে বিকল্প উপায় খুঁজে বের করার কথা বলেছেন, সেই সমস্যাটি সাময়িক নয়, দীর্ঘকালের। তাই এর স্থায়ী সমাধান হওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, যানজট শুধু রাস্তায় আটকে থাকার ভোগান্তি নয়; রাস্তায় আটকে থাকলে জ্বালানি তেলও পুড়তে থাকে, কর্মঘণ্টাও নষ্ট হয়। যে পরিমাণ জ্বালানি তেল পোড়ে তার পরিমাণ বিপুল। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা যদি বাস্তবায়িত করা যায়, অর্থাৎ যানজটের নিরসন বা কমিয়ে আনা যায়, তাহলে রাজধানীর মানুষের জীবনে স্বস্তি নেমে আসবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভোগান্তি থেকে যেমন রক্ষা পাবেন, তেমনি সাধারণ মানুষের চলাচলও সহজ হবে। নগরে গতিশীলতা আসবে।
সমস্যার সমাধান হিসেবে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের পরিবর্তে স্কুলগুলো নিজস্ব বাসে শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার কাজ করতে পারে। পৃথিবীর বড় বড় শহরে, এমনকি জনবহুলও নয়, সে রকম শহরেও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচলকে উৎসাহিত করা হয় না। আরও দু-একটি ব্যবস্থার ওপর সরকার গুরুত্ব দিতে পারে। এর একটি হলো গণপরিবহনব্যবস্থায় স্কুলের শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা করা। এ জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য সরকারি উদ্যোগে কিংবা সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রকল্প গ্রহণ করা যায়। এক দিনে হয়তো তা করা যাবে না, কিন্তু ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে সুফল মিলবে। আসল কথা, রাজধানী এবং দেশের বড় বড় শহরের স্কুলশিক্ষার্থীদের পরিবহন ও গণপরিবহনকে ঢেলে সাজাতে হবে। সে রকম উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।