মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। এই স্বপ্নই তাকে পৌঁছে দিচ্ছে দূর-দূরান্তে। এতটাই দূরে যা মানুষের কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু মর্তের মানুষ পৌঁছে গেছে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরের জায়গায়। মানুষ গড়েছে ভ্রমণের নতুন রেকর্ড। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযানে অংশ নেওয়া চার নভোচারী এই অবিস্মরণীয় বিরল রেকর্ডের অধিকারী হয়েছেন। গর্বিত করেছেন মানবজাতিকে। সংবাদটি এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময় ও অর্জন।
অভিযানটা চন্দ্রাভিযান। গত ৬ এপ্রিল ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলে নভোচারীরা চাঁদের পেছনে সবচেয়ে দূরবর্তী জায়গায় পৌঁছেছেন। পৃথিবী থেকে তখন তাদের দূরত্ব ছিল ৪ লাখ ৬ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটার বা প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৬০ মাইল। এর আগে পৃথিবী থেকে এত দূরে কোনো মানুষ ভ্রমণ করেনি। আগের রেকর্ডটি প্রায় ৫৬ বছর আগের। ওই সময় নভোচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ ১৭১ কিলোমিটার বা প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬৫৫ মাইল দূরে গিয়েছিলেন।
এবারের যাত্রাটি নানা দিক থেকে চমকপ্রদ ও গুরুত্বপূর্ণ। ১ এপ্রিল বুধবার ‘আর্টেমিস-২’ অভিযানে চার নভোচারী–নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন–যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ‘ওরিয়ন’ ক্যাপসুলে চড়ে এ ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেন। ১০ দিনের অভিযানে তারা চাঁদের চারপাশে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে আসছেন। নভোচারীরা এই অভিযানে চাঁদের পেছন দিকে গিয়ে একটি পূর্ণগ্রাস সূর্য গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা চাঁদে নামেননি।
আর্টেমিস-২-এর চন্দ্র যাত্রার লক্ষ্য চাঁদে মানুষের নিয়মিত যাত্রাকে পরীক্ষা করে দেখা। ইতোমধ্যে নাসা ২০২৮ সালের মধ্যে চাঁদের দুর্গম দক্ষিণ মেরুতে নভোচারী অবতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। আর্টেমিস-২ শুধু একটি উৎক্ষেপণ নয়, বরং মানব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে অভিহিত হচ্ছে। উৎক্ষেপণের পর নাসা থেকে বলা হয়েছে, এটি শুধু চাঁদে যাওয়া নয়, আমাদের প্রজন্মের অ্যাপোলো মুহূর্ত। আমরা দেখাব, মানুষ আবার গভীর মহাকাশে পা রাখতে পারে। সেখানে থাকার জন্যই এই অভিযান। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পানি আছে, যা থেকে জ্বালানি ও অক্সিজেন তৈরি করা যাবে। এই মিশনের তথ্যই ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গলযাত্রীদের পথ দেখাবে। এটি প্রমাণ করবে যে মানুষ আবার পৃথিবীর কক্ষপথের নিম্নাঞ্চলের বাইরে যেতে পারে, যেখানে যাওয়া ছাড়া মঙ্গল বা অন্য কোনো গ্রহে যাওয়া সম্ভব নয়।
আর্টেমিস-২ অভিযানে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে; ইতোমধ্যে তা ৯৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এ থেকে প্রাপ্ত প্রযুক্তি-সৌরশক্তি, পানি পরিশোধন, দুর্যোগ পূর্বাভাস পৃথিবীর জন্য নিঃসন্দেহে মানবজাতির মহাকাশ অগ্রাভিযানের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা এই অভিযানের ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও লক্ষ করেছেন। ৩০টির বেশি দেশ–যেমন জাপান, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অভিযানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। চীন ও রাশিয়া এই চুক্তিতে নেই। মহাকাশ অভিযানকে ঘিরে এ এক নতুন শীতল যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে চাঁদের সম্পদ আহরণের পথ খুঁজে পেতে চায়। অন্যদিকে চীন-রাশিয়া জোট আলাদা চন্দ্র স্টেশন বানাচ্ছে। আমরা সেই প্রচেষ্টাকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক মনে করি। সুস্থ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে মানুষ এতে আরও এগিয়ে যাবে।
আমাদের পৃথিবী আজ যুদ্ধবিগ্রহে জর্জরিত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সারা পৃথিবীর মানুষ উদ্বিগ্ন, বিপন্ন। চন্দ্রাভিযান বা যেকোনো মহাকাশ অভিযানের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। একদিকে মানবজাতির অগ্রগতির জন্য বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড চলবে, আবার অন্যদিকে ধ্বংস-সংঘাত মানুষের নির্বিচার মৃত্যু ডেকে আনবে, কখনোই তা সমর্থনযোগ্য নয়। মানবকল্যাণের স্বার্থে এই সংঘাত বন্ধ হওয়া দরকার আর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও অভিযান মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আর্টেমিস-২-এর সাফল্য তখনই আমাদের প্রকৃত উদযাপনের অংশ হয়ে উঠবে, যখন তা পৃথিবীর সব মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। আর্টেমিস-২-এর সফল চন্দ্র অভিযানকে আমরা অভিনন্দিত করছি।