আজ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। বৈশাখী শোভাযাত্রার মাধ্যমে দেশব্যাপী উদযাপন করা হবে দিনটি। পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষীর মানুষ ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এ দিনটি উদযাপন করে থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষের অংশগ্রহণে এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান–এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে তৈরি হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে পাঁচটি বড় মোটিফ। এসব উপাদান বাঙালির গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। ইউনেসকোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া এই বর্ণিল উৎসবের বীজ বপন হয়েছিল আজ থেকে ৪১ বছর আগে সীমান্তবর্তী জেলা শহর যশোরে। ১৯৮৫ সালের ১৪ এপ্রিল (১ বৈশাখ ১৩৯২) যশোরের ‘চারুপীঠ’ চত্বর থেকে প্রথমবারের মতো বের হয় এই শোভাযাত্রা। আর এর নেপথ্যের কারিগর ছিলেন চিত্রশিল্পী মাহবুব জামাল শামীম। ১৯৮৫ সালে ছোট পরিসরে শুরু হলেও দ্বিতীয় বছর থেকে এটি বিশাল আকার ধারণ করে। যশোরের এই সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৮৯ সালে তিনি ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সহায়তায় রাজধানীতে প্রথম শোভাযাত্রার উদ্যোগ নেন। ২০১৬ সালে ইউনেসকো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব ও শিক্ষাক্রমের অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলা নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন জাতীয় উৎসব, অসাম্প্রদায়িক উৎসব। বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের উদযাপন এবং উপলব্ধির উৎসব। ১৫৫৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের আদেশে তার রাজস্ব কর্মকর্তা ফতেহ উল্লাহ সিরাজী ‘সৌর সন’ এবং আরবি ‘হিজরি’ অব্দের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সন তৈরি করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, আকবরের রাজ্যাভিষেকের সূচনাবর্ষ থেকে বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়। সে হিসাবে বঙ্গাব্দের রয়েছে মিলিত ঐতিহ্য, যা সর্বজনীন। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে এই দিনটি আমরা সবাই উদযাপন করে থাকি। পাকিস্তানের শাসন পর্বে বাঙালির সংস্কৃতিকে যখন মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তখনই ছায়ানট রমনার বটমূলে এই পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসে। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক উজ্জীবনের ধারাবাহিকতায় বাঙালি আত্মপরিচয়ের প্রতিষ্ঠা ঘটে, পরে যা বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দিনে আমাদের জাতিসত্তার বিষয়টি নতুন করে স্মরণ করতে পারি। ফলে বাংলা নববর্ষকে ঘিরে কোনো বিতর্ক গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনাও নয়।
পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসাবি (বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান) এবং জাতীয় পর্যায়ে বর্ষবরণ উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈশাখী উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে সরকার। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ অনুষ্ঠান ঘিরে কোনো ধরনের নাশকতার শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন র্যাব মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ।
বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতিও নাজুক হয়ে পড়েছে। এই ক্রান্তিলগ্নে চারদিকে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে সামাজিক জরা এবং নানা প্রতিকূলতা। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিতে তাই সবার চাওয়া–নতুন বছরটি সবার জন্য অনাবিল কল্যাণ বয়ে আনুক। বিশ্ব থেকে সব জরা কেটে যাক। আর এই প্রত্যাশা থেকেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে, ‘তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে’। আমাদের সম্মিলিত প্রাণের দাবি এতেই নিহিত রয়েছে। বাংলা নববর্ষ সেই আর্তি নিয়েই প্রতিবছর ঘুরে ঘুরে আসে। আমরা প্রত্যাশা করছি, অশান্ত পৃথিবী শান্ত হোক, চলমান যুদ্ধ বন্ধ হোক। পৃথিবীব্যাপী যে অস্থিরতা চলছে তা শিগগিরই কেটে যাক।
নববর্ষ উপলক্ষে লেখক, পাঠক, হকার, এজেন্ট, শুভানুধ্যায়ী সবাইকে অফুরন্ত শুভেচ্ছা।