জ্বালানির দাম বাড়ানোর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিবহন খাতে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রাজধানীমুখী পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক ভাড়া বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নিত্যপণ্যের দাম ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে জনজীবনের খরচ আরেক দফা বাড়বে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাসের মাথায় দেশে জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষির উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে নতুন করে চাপে পড়বেন দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ধাপে পরিবহন খরচ বাড়ে। দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পরোক্ষ শর্তে দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়ানো হয়। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে না। প্রয়োজন হলে দামের সমন্বয় করে আগামী মে মাস থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর চিন্তা করা হবে। কিন্তু গত শনিবার রাতে তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। সরকারি সিদ্ধান্তের আগেই পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়তে দেখা যায়। নতুন ভাড়া নির্ধারণের আগেই দূরপাল্লার বাসেও ভাড়া বাড়ানোর খবর পাওয়া গেছে। এদিকে গত রবিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি আইএমএফের চাপে নয়, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও সরকারি তহবিলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দাম বাড়ানো হয়েছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নতুন করে শুরু হয়নি; বরং এর প্রভাব আগেই পড়তে শুরু করেছে। এখন দাম বাড়ানোর ফলে এই চাপ আরও বেড়ে গেছে। যদি পর্যাপ্ত তেলের মজুত থাকে, তাহলে সংকট তৈরি হলো কেন? এ ধরনের পরিস্থিতি জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে পেট্রলপাম্পগুলোয় বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন–বাজারে কার্যকর মনিটরিং এবং স্বচ্ছ নীতি নির্ধারণ, জ্বালানির বিকল্প উৎস ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, গণপরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষকদের জন্য ভর্তুকি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা। এ ছাড়া জনগণকেও সচেতনভাবে জ্বালানির ব্যবহার কমানো ও সাশ্রয়ী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে জনজীবনে চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এমনিতেই বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি। নিত্যপণ্যের দাম বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি এমনিতেই চাপে রয়েছে। এখন জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ায় এই চাপ আরও বেড়েছে। যাতায়াত খরচ ও যানবাহনের টিকিটের দাম, উৎপাদন খাত এবং আমদানি-রপ্তানি শিল্পের ওপর প্রভাব পড়বে। এর ফলে ভোক্তা এবং উৎপাদক- উভয়ই বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বেড়ে যেতে পারে। তাই জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।