জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন ভোক্তারা। বাজার করতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ আয়ের মানুষ। চালসহ সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। সীমিত আয়ের মানুষের আয় না বাড়ায় বাড়তি ব্যয়ের চাপ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ার পর প্রথম ধাক্কা লাগে পরিবহন খাতে। সরকারিভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের সিদ্ধান্তের আগেই বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রাক ভাড়া এক লাফে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের পাইকারি বাজারে। পাইকারি দামের এ পরিবর্তন ধীরে ধীরে ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এ ছাড়া যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ প্রায় সব খাতের ব্যয় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে শিল্প খাতে খরচ বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপে মোট রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে ভ্যাট বা মূসকের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, ভ্যাটের পরিমাণ বাড়ানোয় দাম বেড়ে যাবে অনেক জিনিসপত্রের। খরচ বাড়বে ব্যবসা ও শিল্প খাতের। এতে চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটি ‘চেইন প্রভাব’ সৃষ্টি করে। এর ফলে উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করে। সতর্ক করে তারা বলেন, জ্বালানি খরচ দীর্ঘ সময়ে উচ্চ অবস্থানে থাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানায়, সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেল, মাঝারি চাল, খোলা আটা, ডিম, শসার দাম বেড়েছে। সরকারি সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বাজারে সোনালি মুরগির দাম ৪৫ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ৭ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া কৃষি বিপণন অধিদপ্তর দৈনিক ১৫টি সবজির দামের তালিকা প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, গত বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে ৯টি সবজির দাম বেশি। দাম কম রয়েছে ৪টির।
প্রায় দুই মাস ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহসংকট চলছে। ক্রেতারা অনেক সময় কয়েক দোকান ঘুরে সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন না। ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে চায়। কিন্তু সরকার এখনো অনুমতি দেয়নি। ইতোমধ্যে কোম্পানিগুলো ডিলার বা সরবরাহকারী পর্যায়ে বোতলজাত তেলের দাম বাড়িয়েছে। এতে ক্রেতাদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
তথ্য বলছে, গত দুই মাসে প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। সেই সঙ্গে দুই দফায় এলপি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পণ্যের দামে। এতে বাড়তি চাপে পড়তে হচ্ছে সীমিত আয়ের মানুষকে। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। কারণ মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ব্যয় সামলাতে হিমশিম খায় সাধারণ মানুষ। সরকারি তথ্যমতে, টানা তিন বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে আছে দেশ। সাধারণত সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি থাকছে। বাংলাদেশ খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিতে (লাল শ্রেণিতে) রয়েছে বলে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এ ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুধার্ত মানুষের বসবাসের তালিকায় থাকা শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। গত বছর বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই ওই ১০টি দেশে বসবাস করছে। চলতি বছরও এসব দেশে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা কম।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, বাজারে একসঙ্গে অনেক পণ্যের দাম বাড়ায় ভোক্তারা, বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষ খরচের চাপে পড়েছেন। পরিবহন খরচসহ সামগ্রিকভাবে পণ্যের দামে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এ সুযোগকে পুঁজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এতে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ নাগরিকদের জীবন চিড়েচ্যাপটা। অসহনীয় চাপ কমাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে এবং বাজার তদারকিব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। আসন্ন বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো খুবই প্রয়োজন। আশা করছি, সরকার সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিজনিত চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে রেহাই দিতে সক্ষম হবে।