আজ মহান মে দিবস। মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। শ্রমিক হিসেবে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অধিকারপ্রাপ্তি ও আদায়ের দিন। বিশ্বব্যাপী দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও দিনটি বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে। নানা অনুষ্ঠান ও সভা-সেমিনারের মাধ্যমে দিনটি পালন করে থাকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া বেসরকারিভাবেও দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মে দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বিশেষ অনুষ্ঠান ও টকশো সম্প্রচার করে। এ ছাড়া জাতীয় দৈনিকগুলোয় বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়। মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানের মধ্য দিয়েই মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা প্রস্ফুটিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের আইনি স্বীকৃতি এলেও এখনো বাস্তবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির পূর্ণতা পায়নি। তাই মে দিবসে সবার চাওয়া কাজের স্বীকৃতি এবং কর্মঘণ্টা নির্ধারণের পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালের এদিনে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সেদিন থেকে বিশ্বের মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হয়ে আসছে। উনিশ শতকের শুরুতে শ্রমিকরা কলকারখানায় সপ্তাহে ছয় দিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। মজুরি যা পেতেন তা দিয়ে জীবনধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ত। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বা সামাজিক নিরাপত্তাও ছিল না। এর বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো আমেরিকায়ও অসন্তুষ্টি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং বিশ্বব্যাপী দৈনিক ৮ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা নির্ধারিত হয় শ্রমিকদের জন্য। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমাবেশে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চরম ধাক্কা লাগে। এ সময় শ্রমিক শ্রেণি তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। দেশি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে নেমে আসে চরম খরা। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে বহু মানুষ তাদের কর্ম হারায়। এ ছাড়া বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবে দেশকে নানা রকম সংকটে এখনো পড়তে হচ্ছে। এ অবস্থায় মেহনতি মানুষের অসন্তুষ্টি থেকেই যাচ্ছে। অনেক শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে, তাদের ঝুঁকি ভাতা দূরের কথা, ঠিকমতো বেতনই দেওয়া হয় না। এসব অবহেলিত, বঞ্চিত শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। আমরা দেখেছি, বর্তমান সরকার দেশের শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন ও কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করেছে। বিশেষ করে যেসব কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, সেসব খুলে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া মেহনতি মানুষের ন্যায্য দাবি নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও যুগোপযোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্ন শ্রমপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক-মালিক সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না করে এবং তাদের কর্মঘণ্টা ঠিক রাখার ব্যাপারে মালিকপক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে। যেসব মেহনতি মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করেন, তাদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
মহান মে দিবসের এদিনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব মেহনতি মানুষকে শুভেচ্ছা।