সমস্যাটি আকস্মিকভাবে নয়, তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতায়। স্মার্টফোনের আসক্তিতে আমাদের শিশু-কিশোররা ডুবে আছে। দিনের অধিকাংশ সময় তারা ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের ভার্চুয়াল জগতে আচ্ছন্ন থাকছে। এ জগৎ মূলত অলীক, বাস্তবের নয়; এমনকি সৃজনী-কল্পনার জগৎও নয়। বর্তমান প্রজন্ম এভাবে বন্দি থাকায় খেলাধুলা আর বইয়ের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অনেকেই ভুগছে মানসিক সংকটসহ নানা ধরনের অপরাধে। দেখা দিচ্ছে শারীরিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট। একটা পুরো প্রজন্ম এখন প্রযুক্তির সুফল পাওয়ার চেয়ে প্রযুক্তির আগ্রাসনে বিপন্ন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে এই সংকট এতটাই বিস্তৃতি পেয়েছে যে বিশ্ব গণমাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণের খবর বেরোচ্ছে। উন্নত দেশগুলোই এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসছে সবার আগে। ১৬ বছরের নিচের শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ করছে স্মার্টফোনের ব্যবহার।
উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর পার্থক্য অনেক। মূল পার্থক্য শিশুদের সুরক্ষায় তাদের নানা ব্যবস্থা রয়েছে। আইনকানুনের পরিবর্তে পারিবারিক সামাজিক রাষ্ট্রিক পরিবেশ এমন যে শিশুরা সেখানে নিরাপদে বেড়ে ওঠে। এর পরও তারা স্মার্টফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। সেই তুলনায় আমাদের দেশে শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি বেশ নাজুক। সামাজিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার অভাবে শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে স্মার্টফোনের ব্যবহার তাদের আরও অনিরাপদ করে তুলছে। তারা মানসিক ও শারীরিক সমস্যায় ভুগছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশে এখন শিশু-কিশোরদের জন্য স্মার্টফোনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা জরুরি। শিশু-কিশোরদের নানামুখী সংকট যেভাবে বাড়ছে, তাতে এর কোনো বিকল্প নেই।
স্মার্টফোন হাতে পেলে শিশু-কিশোররা প্রথমেই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্ত হয়। ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবে সময় কাটায়। স্কুলের সময়টা যেভাবেই হোক, বাকি সময় এসবে বুঁদ হয়ে থাকে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীকে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়। প্রায় সম্পূর্ণ মনোযোগ স্মার্টফোনে নিবদ্ধ থাকে। খেলাধুলা না করায় শরীর স্থূল হয়ে পড়ে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা দেখা দেয়, পড়াশোনায় ঘাটতি পড়ে, সৃজনীক্ষমতা লুপ্ত হতে থাকে।
বিশ্বজুড়ে সাইবার বুলিং ও ডিজিটাল হয়রানি একধরনের স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের যৌন হয়রানিও ঘটে। কিছুদিন আগে এই অপরাধে বাংলাদেশের একজনকে মালয়েশিয়া থেকে আটক করে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ। কোমলমতি ছেলেমেয়েদের কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক-মেসেঞ্জারের মাধ্যমে কাছাকাছি চলে আসায় হার্দ্রিক টানাপোড়েনেরও শিকার হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা ঘটছে। এতে বাড়ছে মানসিক সংকট, ব্যাঘাত ঘটছে পড়াশোনায়। পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে যদি বেশি সময় দেয়, তাহলে পারিবারিক বন্ধন স্বাভাবিক থাকে। ভার্চুয়াল জগতে শিশু-কিশোররা বেশি সময় কাটানোর জন্য এই বন্ধনও এখন অনেকটাই শিথিল, বিশেষ করে নগরজীবনে। একসময় রূপকথার বই বা অন্য সৃজনশীল বই পড়ে শিশুরা বেড়ে উঠত। স্মার্টফোনের কারণে এই অভ্যাস এখন উঠেই গেছে। বই পড়ার পরিবর্তে ফেসবুকে সময় কাটাতে ভালোবাসে শিশুরা। অপরাধ জগতেও তাদের প্রবেশ ঘটছে সহজেই। কিশোর গ্যাংয়ের উৎপত্তির উৎস এই স্মার্টফোন।
সোশ্যাল মিডিয়ার এই আসক্তি এখন বিশ্বজনীন সমস্যা। শিশু সুরক্ষায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার কিশোর-কিশোরীদের সুরক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞা অনুসারে ১৬ বছরের কম বয়সীরা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে পারবে না। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, ইংল্যান্ড সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশুদের প্রবেশাধিকার প্রতিরোধ করার জন্য নিজস্ব পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। আমাদের দেশেও এখন এই বয়সী শিশুদের জন্য এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে। খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই অভিমতই দিয়েছেন দেশের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী নিষিদ্ধের নির্দেশনা চেয়ে রিটও করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের এর হাত থেকে রক্ষা করা না গেলে একটা প্রজন্ম ঝুঁকির মধ্যে থাকবে। নিষিদ্ধের বিষয়টি এখনই ভেবে দেখা প্রয়োজন। তবে এককভাবে নয়, এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। আমরা মনে করি, সরকারের একার পক্ষে এটা নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। অভিভাবক, শিক্ষক, পুলিশ, সমাজপতিদের সম্মতি ও গণমাধ্যমের প্রচারের সম্মিলিত উদ্যোগেই এটা নিষিদ্ধ করা সম্ভব। সরকার এ জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারে। অন্য দেশগুলো যেহেতু অনেক ভেবেচিন্তে, গবেষণা করে নিষিদ্ধ করেছে, আমাদেরও শিশু-কিশোরদের জন্য নিষিদ্ধ করা জরুরি।