রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা ক্ষেত্রেও সমান দক্ষতা তার। দেশের অন্যতম ব্যবসায়ী গ্রুপ মাল্টিমোডের কর্ণধার ছাড়াও ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান তিনি। গত দুই দশক ধরে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ক্ষমতার পট পরিবর্তনে অনেকে বিতর্কে জড়ালেও আবদুল আউয়াল মিন্টু নিজেকে বিতর্কের বাইরে রাখার পাশাপাশি একজন সৎ ব্যবসায়ীর ভাবমূর্তিও ধরে রাখতে পেরেছেন। গত সোমবার নিজের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে খবরের কাগজের মুখোমুখি হয়ে চলমান রাজনীতির পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়েও কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের ডেপুটি বিজনেস এডিটর ফারজানা লাবনী।
খবরের কাগজ: আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি বিএনপির সমর্থন না করার কারণ কী?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: বিএনপি জনমানুষের দল। গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চা করার পক্ষে রয়েছে এই দলটি। আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের নির্যাতন ও গুম-খুন করা হয়েছে। তারপরও আক্রোশের বশবর্তী হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে না বিএনপি। সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সহনশীল পরিবেশে রাজনৈতিক চর্চা চাই।
খবরের কাগজ: বর্তমান সরকার শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে বিচার করতে চায়। সরকার কি সক্ষম হবে?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: প্রশ্ন হচ্ছে, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার ইচ্ছে আছে কি না, ফিরিয়ে আনার আইনি সুযোগ আছে কি না এবং তা কত দিনে কার্যকর করা সম্ভব। আমরা জানি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বন্দি বিনিময় চুক্তি আছে। এই চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার আইনি সুযোগ আছে। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করতে সরকারের কত দিন লাগবে। ভারতেও তো আইন আদালত আছে। সে দেশের আইন কী বলছে? শেখ হাসিনা ভারতের আদালতে গিয়ে যদি বলেন যে, বাংলাদেশে আমাকে ফেরত পাঠানো হলে আমার কঠিন শাস্তি হবে। তাহলে ভারতের আদালত কী রায় দেবে তা দেখতে হবে।
খবরের কাগজ: বর্তমান সরকার বিভিন্ন খাতের ব্যাপক সংস্কারের কথা বলছে। এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সংস্কারের লক্ষ্যে কমিশন গঠন করেছে। সংস্কারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার সার্থক করতে রাজনৈতিক লোকদের দিয়ে সংস্কার করাতে হবে। বিএনপি এতদিন আন্দোলন করেছে গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য। আশা করি সেই স্বপ্ন দ্রুতই পূরণ হবে।
খবরের কাগজ: বিএনপি একদিকে সংস্কারের কথা বলছে। অন্যদিকে নির্বাচনের জন্য চাপ দিচ্ছে…
আবদুল আউয়াল মিন্টু: আমার প্রশ্ন হচ্ছে যেসব সংস্কারের কথা বর্তমান সরকার বলছে তার সবটা কি তাদের পক্ষে শেষ করা সম্ভব? সব সংস্কার কি একটি অরাজনৈতিক সরকারের পক্ষে করা সম্ভব? বিএনপি সংস্কারের বিপক্ষে না। কিন্তু নির্বাচন তো দিতে হবে। একটি রাজনৈতিক দল একটি দেশের অর্থনীতি বিকাশের জন্য খুব জরুরি। সরকারকে পরিষ্কার করতে হবে তারা কত দিনে নির্বাচন দেওয়ার কথা ভাবছেন। নির্বাচনের জন্য একটি রোডম্যাপ থাকতে হবে। কিছু সংস্কার তো নির্বাচিত সরকারের জন্যও রাখতে হবে।
খবরের কাগজ: উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। বিগত সরকারের সময় থেকে পণ্যমূল্য বেড়েই চলেছে। বর্তমান সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কথা বললেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: বিগত সরকার পণ্যের উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ে প্রতিনিয়ত মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। মিথ্যা দিয়ে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের বিভ্রান্ত করেছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। বর্তমান সরকার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। এতে এলসি খোলা কমেছে। এলসি খোলা কমার কারণে আমদানি কমেছে। আমদানি কমার ফলে কাঁচামাল কম আসছে। ফলে উৎপাদন বাড়ছে না। আমদানি করা খাদ্যপণ্যও কম আসছে। কীভাবে মূল্যস্ফীতি কমবে?
খবরের কাগজ: তাহলে মূল্যস্ফীতি কীভাবে কমানো সম্ভব?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা মেটাতে শিল্প খাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে। দেশের উৎপাদন না বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে। উৎপাদন বাড়াতে হলে কারখানা ও শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। ভালো বীজ, কৃষকের দক্ষতা এবং প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটিয়ে জমিতে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। ১৫ বছর আগে উৎপাদনশীলতা কমতে শুরু করে। গত পাঁচ বছরে তা আরও কমে গেছে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেই। উল্টো সামাজিক বিশৃঙ্খলা, শ্রমিক অসন্তোষ বেড়ে গেছে। কারখানাগুলোতে হামলা, আন্দোলন চলছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতির সমাধান দরকার।
খবরের কাগজ: দেশে বিনিয়োগ বাড়ছে না। বিনিয়োগ বাড়াতে বর্তমান সরকারের কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা আছে। এ জন্য দরকার বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এ ছাড়া ব্যবসা শুরু করার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সময়সীমা, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও শুল্কহার কমাতে হবে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, অবকাঠামো- এসব খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেশি আছে। বিনিয়োগের বাধা দূর করতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। আমি বেশ আশাবাদী। কারণ প্রথমত, প্রতিবছর ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। তাই শ্রমের অভাব নেই। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার উন্নত দেশগুলোয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে যা ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সরকার পণ্যের শুল্ক কমাবে, যা বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে দেশের ৯৫-৯৬ শতাংশ বিনিয়োগ স্থানীয়। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সঞ্চয় কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে যেতে পারছে না, যা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিষয়টি সরকারকে বিবেচনায় রাখতে হবে।
খবরের কাগজ: সরকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কাজ করার কথা বলছে। ব্যবসায়ে গতি আনতে আপনার সুপারিশ কী?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: আমি মনে করি দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নিতে হলে সরকারকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা আরও বাড়াতে হবে। বেসরকারি খাতের সংগঠনগুলোকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে বের করে আনতে হবে। এই সংগঠনগুলো আগেও ছিল। গত ১৫ বছরে দেশের ওপরের দিকের ব্যবসায়ীরা দুই ভাগে ভাগ হয়েছেন। একটি অংশ সম্পদ তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। আরেকটি অংশ লুটপাট করে সম্পদের মালিক হয়েছেন। এরা অর্থনীতিতে ক্ষমতাবান, রাজনীতিতেও ক্ষমতাবান। তারা লুণ্ঠনের টাকা আবার পাচার করে দিচ্ছেন।
খবরের কাগজ: দেশে বেকারত্বের সমস্যা সমাধানে কী করা উচিত?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: প্রতিবছর দেশের চাকরির বাজারে কর্মক্ষম হয়ে আসে ২০-২২ লাখ মানুষ। এর সঙ্গে কৃষি খাতে বেকার হয়ে পড়া আরও এক-দুই লাখ লোক চাকরির জন্য বাজারে আসে। আমরা তো সবাইকে বিদেশে পাঠাতে পারব না। আমরা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করে দেশেই কর্মসংস্থান করি। সমস্যা হলো বিনিয়োগ যদি না হয়, তাহলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? সরকারকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সামাজিক মূলধন বাড়াতে হবে।
খবরের কাগজ: সামাজিক মূলধন বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন?
আবদুল আউয়াল মিন্টু: আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ যতটুকুই করি, তার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক মূলধন। সামাজিক মূলধন সৃষ্টি হয় মানুষের মাঝে একতা থাকলে, আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে হলে, একে অন্যকে বিশ্বাস করলে, যথাযথভাবে চুক্তির বাস্তবায়ন হলে। যে সমাজে একে অন্যকে বিশ্বাস করে না, এক দল আরেক দলকে শত্রু মনে করে, এক দল আরেক দলের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বিষোদগার করে, মারামারিতে জড়িত থাকে সে সমাজে তো কখনো সামাজিক মূলধন সৃষ্টি হওয়া কঠিন।