নারীর চলার পথ এখনো মসৃণ না। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশের নারীরা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। নারী যত এগিয়েছে, প্রতিবন্ধকতাও তত শক্তিশালী হয়েছে। নারীকে শিক্ষিত, স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। সরকারকেও নারীর অধিকার আদায়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। ধর্ষকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গত বৃহস্পতিবার নিজ দপ্তরে খবরের কাগজের ডেপুটি বিজনেস এডিটর ফারজানা লাবনীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তুলে ধরা হলো এখানে-
খবরের কাগজ: স্বাধীনতার অনেকগুলো বছর পার করে ফেলেছি আমরা। দেশে নারীর অবস্থান কেমন বলে মনে করছেন?
রিজওয়ানা হাসান: দেশে শিক্ষিত নারীর সংখ্যা বেড়েছে। সমাজ-সংসারে নারীর ক্ষমতায়ন বাড়ছে। চাকরিজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। তাহলে কি ধরে নেব যে নারীর চলার পথ মসৃণ হয়েছে? না, নারীকে এখনো পরিবারে ও পরিবারের বাইরে- সব জায়গায় বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। রাস্তাঘাটে, গণপরিবহনে, অফিস-আদালতে, বেড়াতে গেলে, শপিংয়ে, শিক্ষাক্ষেত্রে- প্রায় সবখানেই নেতিবাচক পরিবেশের মুখে পড়তে হচ্ছে।
খবরের কাগজ: নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে হলে আপনার পরামর্শ কী?
রিজওয়ানা হাসান: নারীকে স্বাবলম্বী হতে হবে। নিজের চলার খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হবে। তাকে আয় করতে জানতে হবে। তবেই নারী মর্যাদা পাবে। নারীকে শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শিক্ষিত নারী নিজের জন্য, সমাজের জন্য শক্তি। তবে নারীর অধিকার অর্জনে তাড়াহুড়া করা যাবে না।
খবরের কাগজ: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ধর্ষণ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ থেকে মুক্তির উপায় কী?
রিজওয়ানা হাসান: যৌন হয়রানি বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি দিতে হবে। নারীকে সেক্সিস্ট ইমেজ থেকে বের করে আনতে হবে। একসময়ে ১ টাকার ছবিতে নারী কী পরে ছিল! আর এখন নারীর পোশাক নিয়ে এত কথা কেন! তাহলে কি আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি! নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে নারীও মানুষ।
খবরের কাগজ: আপনি তো সব সময় নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলেছেন। এখন সরকারের অনেক বড় দায়িত্বশীল পদে কাজ করছেন। আজকের এই অবস্থানে আসতে আপনাকে কেমন বাধার মুখে পড়তে হয়েছে?
রিজওয়ানা হাসান: আমি ওই সব নারীর মতো, যাদের সামনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে থামিয়ে দেওয়া যায় না, যারা সহজে ভেঙে পড়ে না। যত বাধা এসেছে, আমি আরও ভালোভাবে নিজেকে তৈরি করে এগিয়েছি। ধরুন, আমি একটা গাড়ি থেকে নামলাম, আমি হয়তো শাড়িটা পায়ের কাছে ঠিক করলাম। তখন ওইটাই ভিডিও করে ভাইরাল করে দিল। বলা হয়, সুন্দরী উপদেষ্টা, আরও কত কিছু। যা হয়তো মুখেও আনা যায় না। এসব করা হয় মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য। এসবে নারীর হয়তো কিছু হয় না। কিন্তু তার পরিবারের লোকেরা কিছু মনে করলেও করতে পারে।
খবরের কাগজ: আপনি আপনার বাবা-মা-সন্তান, স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকদের কাছ থেকে কী ধরনের বাধার মুখে পড়েছেন?
রিজওয়ানা হাসান: আমি ভাগ্যবতী নারী। আমার স্বামী আমার কাজে সমর্থন দেন। আমাকে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করেন। আমি বিদেশে পড়তে যেতে চেয়েছিলাম। আমার বাবা রাজি হননি। একজন মেয়েকে একা বিদেশে ছাড়তে চাননি। ছেলে হলে নিশ্চয় ছাড়তেন। তবে আমি আমার মেয়েকে বিদেশে পড়তে যেতে দিয়েছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আস্থা বেড়েছে। শুধু তা-ই না, আমার মেয়েকে যেখানে পড়িয়েছি, আমার দুই ছেলেকে সেখানে পড়াইনি। মেয়েকে সুবিধা বেশি দিয়েছি। আবার আমার যা সম্পদ আছে, তা তিন সন্তানের মধ্যে সমান ভাগ করে দেওয়ার কথা বলেছি। মেয়ে বলে কম দেওয়া হবে না। আমার সন্তানরা ভাইবোনের সমান অধিকারে বিশ্বাস করে। আমি কাজ সেরে বাসায় গেলে আমার কন্যা বিভিন্ন প্রশ্ন করে। সে লক্ষ্য রাখে নারীর পক্ষে আমি কী বলছি। এটাই তো নারীর এগিয়ে চলা। মায়ের চেয়ে মেয়ে তার ন্যায্য পাওনা বেশি পাবে। আমার পরিবার জানে আমি কতটা সততার সঙ্গে কাজ করছি। তাই তারা আমার পাশে থাকে, সহযোগিতা করে।
খবরের কাগজ: জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের পর এ দেশে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। নতুন সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বর্তমান সরকার নারীদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কী করছে?
রিজওয়ানা হাসান: বর্তমান সরকার নারীবান্ধব। নারীর সমস্যা চিহ্নিত করে তার সমাধানে কাজ করছে। নারী ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে বাধা এলে তার সমাধান কিন্তু এই সরকার করেছে। শুধু তা-ই না, সরকারের বড় বড় পদে অনেক যোগ্য নারীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য যা যা করার সবই করছে বর্তমান সরকার। বিশেষভাবে বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এযাবৎকাল নারীর ক্ষামতায়নের জন্য, নারীর অধিকার নিশ্চিত করার জন্য কী কী করেছেন তা আপনারা জানেন। আমি যখন উপদেষ্টা হইনি, তখনো নারীর অধিকার আদায়ে অনেক কিছু করেছি। এখনো আমি নারীর অধিকার আদায়ের পক্ষে জোরালো। এখন অনেক টিএনও, ডিসি কিন্তু নারী।
খবরের কাগজ: পরিবার থেকে নারীর অধিকার রক্ষায় কীভাবে সহযোগিতা করা উচিত বলে আপনি মনে করেন? শিক্ষাক্ষেত্রে ভূমিকা কী হতে পারে?
রিজওয়ানা হাসান: পরিবার থেকে নারীকে সাহস দিতে হবে। সে যেন থানায় গিয়ে নিজের সমস্যা জানাতে পারে। কোথাও যৌন হয়রানির শিকার হলে সে যেন প্রতিবাদ করতে পারে। নারীর অধিকার আদায়ে পরিবারকে নারীর পাশে থাকতে হবে। পরিবার পাশে থাকলে নারীর পক্ষে যুদ্ধে জয় সহজ হয়। একইভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর যৌনপীড়নের ঘটনাকে ঢেকে বা গোপন না করে সবার সামনে আনতে হবে। অপরাধীকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
খবরের কাগজ: যৌন হয়রানির পাশাপাশি নারীর প্রতি শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়ন থামছেই না। আপনি কী মনে করেন?
রিজওয়ানা হাসান: শারীরিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি- এখনো চলছে। একই সঙ্গে নেগেটিভ কথা বলে নারীকে আটকে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশের নারীরা তো পাহাড়ে উঠেছে। তারা প্রমাণ করেছে তারা পারে। বিমান চালাচ্ছে। ক্রিকেট খেলছে। অস্ত্র কাঁধে যুদ্ধে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে। সরকারের ওপরের পদে কাজ করছে। তাহলে নারীকে কেন ছোট করা হবে? নারীকে কেন ভোগের বস্তু ভাবা হবে? নারীকে নিয়ে ফেসবুকে নোংরামি করা যাবে না। চটকদার রিল বানানো যাবে না। মনে রাখতে হবে, নারী একজন মানুষ। তাকে মর্যাদা দিতে হবে।