সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) প্রেসিডেন্ট। দেশে আইনের শাসন, মানবাধিকার, পরিবেশ রক্ষাসহ জনস্বার্থে বিভিন্ন মামলায় আইনি লড়াই করে পরিচিত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের নিজস্ব প্রতিবেদক মাহমুদুল আলম।
খবরের কাগজ: তফসিল অনুসারে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কেমন নির্বাচন প্রত্যাশা করেন?
মনজিল মোরসেদ: তফসিলটা একটা টার্নিং পয়েন্ট। গত জুন মাসে লন্ডন থেকে সরকার বলেছিল আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে জাতীয় নির্বাচন হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি তা বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু রাস্তায় বের হলে দেখতাম, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস আছে যে, সত্যিই নির্বাচন হবে কি না। বিএনপির মধ্যেও অনিশ্চয়তা কাজ করছিল যে, সরকার নির্বাচন দেওয়ার ওয়াদা রক্ষা করবে কি না। সাধারণ মানুষেরও সন্দেহ ছিল যে, আসলেই নির্বাচন হবে কি না। তফসিল ঘোষণার পর সে আশঙ্কা কমে গিয়েছিল। তবে তফসিলের পর সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ায় নির্বাচন হওয়া নিয়ে আবার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খবরের কাগজ: জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সম্প্রতি দুই উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছেন। বিষয়টি কেমন মনে হচ্ছে?
মনজিল মোরসেদ: মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেখেছে। অন্তর্বর্তী সরকারকেও সে রকম নিরপেক্ষ আশা করছে। এই উপদেষ্টারা নির্বাচনের আগে পদত্যাগ করবেন–এমন প্রত্যাশা মানুষের ছিল, দাবি ছিল। কিন্তু পদত্যাগ করলেও তারা যদি নির্বাচনে প্রার্থী হন, নৈতিকতার জায়গা থেকে তা ঠিক হবে না। কারণ তারা সরকারে ছিলেন, সরকারে এখনো তাদের সাবেক সহকর্মী উপদেষ্টারা আছেন, তাই এই দুই প্রার্থীর প্রতি পক্ষপাতিত্বের সন্দেহ থাকতে পারে। একই সন্দেহ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতিও থাকতে পারে। তাই সদ্য পদত্যাগ করা উপদেষ্টাদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া উচিত হবে না।
খবরের কাগজ: জুলাই আন্দোলনের পর ব্যাপক আলোচিত শব্দ ‘নতুন বন্দোবস্ত’। নির্বাচনে নতুন বন্দোবস্ত বাস্তবায়নে অগ্রগতি কেমন দেখছেন?
মনজিল মোরসেদ: মানুষ পরিবর্তনের আশা করেছিল সত্য। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করা শুরু হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হয়েছে, সংবিধান ছুড়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে–মানুষ এসব চায়নি, এমন বন্দোবস্ত চায়নি। পরিবর্তন বা নতুন বন্দোবস্ত মানে তো স্বাধীনতাবিরোধীদের ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ নয়।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের আগে অনেকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলছেন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কি দেখতে পাচ্ছেন?
মনজিল মোরসেদ: লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে কি না, তা বলবে রাজনৈতিক দলগুলো। বলা হচ্ছে, জাসদ, জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত) নির্বাচন করতে পারবে না। কিন্তু ভোটারদের মধ্যে যারা এই ১৪ দলকে ভোট দিতে চান, তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বন্দোবস্ত তো নেই! তাহলে আর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হলো কোথায়? তা ছাড়া যারা ভোটে অংশগ্রহণ করতে পারবে তাদের মধ্যেও কেউ কেউ বলছে যে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামী তো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও সমালোচনা করছে।
খবরের কাগজ: জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটও হবে। গণভোটে চারটি প্রশ্নের এক উত্তর হ্যাঁ অথবা না। গণভোট কি জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে?
মনজিল মোরসেদ: নতুন বন্দোবস্ত বা ইতিবাচক পরিবর্তনের জায়গা থেকে এই উদ্যোগ ছিল খুবই ভালো। কিন্তু এই পদ্ধতির কারণে বিষয়টিকে আঁতুড়ঘরেই মেরে ফেলার বন্দোবস্ত মনে হচ্ছে। যেমন ধরেন সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন এনে সংসদ সদস্যদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সব প্রশ্নে সায় দেওয়া বা ‘না’ ভোট দিয়ে সব প্রশ্নের বিরুদ্ধে চলে যাওয়া হবে। সে কারণে অনেকে হয়তো ভোটই দেবেন না। কারণ মানুষের তো কোনো প্রশ্নের জবাবে হ্যাঁ, আবার কোনো প্রশ্নের জবাবে না মত থাকতে পারে। সেখানে চার প্রশ্নের এক জবাব শুধু ‘হ্যাঁ’ বা শুধু ‘না’ হলে তো হয় না। এদিকে বিএনপি তো বলেই রেখেছে যে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
খবরের কাগজ: বর্তমানে গণমাধ্যমের ভূমিকা কি স্বাধীন দেখছেন?
মনজিল মোরসেদ: গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন তা বুঝতে হলে সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা দেখতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে যেসব সাংবাদিক গণতন্ত্রের কথা বলতেন, বাকস্বাধীনতার কথা বলতেন, এখন তো তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে! আগে হয়তো বাইরে থেকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হতো। আর এখন গণমাধ্যম হাউসে হাউসেই লোক নিয়োগ দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে আপনি (সংবাদকর্মী) যাই লিখবেন, হাউসে বসে থাকা লোকরা নির্ধারণ করবেন, কোনটা প্রকাশ হবে আর কোনটা হবে না।
খবরের কাগজ: রাজনীতিতে বর্তমানে কেমন ধারা দেখছেন?
মনজিল মোরসেদ: সুষ্ঠু রাজনীতি তখনই হবে যখন সবাই রাজনীতি করতে পারবেন। নাগরিকদের একটা পক্ষকে বাদ দিয়ে নয়। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সব দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলে সেটা হবে ‘সিলেক্টিভ’ গণতন্ত্র।