ইরানে হামলা চালিয়ে দেশটির চারজন সেনাকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। ইরাক এবং সিরিয়ায়ও ধারাবাহিক হামলা বজায় রেখেছে দখলদার দেশটি। ইরানে হামলার পর ইসরায়েল বলেছে, সামরিক স্থাপনাই ছিল তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু। আর ‘ইরান ও তাদের সহযোগী’দের হামলার জবাব দিতেই তারা এ হামলা করেছে।
আর ইরান বলেছে, তারা গাজা, লেবানন ও তাদের নিজেদের লোকজনের ওপর ইসরায়েলের হামলা প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে। এই প্রথম ইরানে হামলার পর ইসরায়েল প্রকাশ্যে এর দায় স্বীকার করল।
রানে কী ঘটেছে এবং এর ফলাফল কী হতে পারে- এ সম্পর্কে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
ইরানে কী হয়েছিল, কখন হয়েছিল
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইওয়াভ গ্যালান্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ইরানে হামলার পরিকল্পনা অনুমোদন করেন বলে জানা গেছে। ইসরায়েলের গণমাধ্যম জানিয়েছে, গত শুক্রবারই ইরানকে এ হামলার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এরপর গত শনিবার তেহরানের স্থানীয় সময় রাত ২টায় ইসরায়েল হামলা শুরু করে।
ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র পরে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির মাধ্যমগুলোর ওপর হামলা হয়েছে। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও ছিল তাদের হামলার লক্ষ্যস্থল।
যুক্তরাষ্ট্রের এক সামরিক গবেষকের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে একটি বিলুপ্ত পারমাণবিক গবেষণাগার এবং একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানি ডিপোও ছিল।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেন, ইরানের এ হামলায় যুক্তরাষ্ট্র জড়িত ছিল না। তবে হামলার পর এ ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানানো হয়।
ইসরায়েল বলেছে, যে যুদ্ধবিমানগুলো হামলা পরিচালনা করেছে, সেগুলো তাদের ঘাঁটিতে নিরাপদে ফিরে এসেছে।
ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর বলেছে, তেহরান, ইলাম ও খুজিস্তানে হামলা হয়েছে। তবে সেগুলোর যথাযথ জবাব দেওয়া হয়েছে। আর এতে ক্ষয়ক্ষতিও খুব কম।
আর ইসরায়েল বলেছে, তারা ২০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইরান অভিযোগ করেছে, ইরাকের আকাশসীমা ব্যবহার করে হামলা করেছে ইসরায়েল।
হামলার ব্যাপারে কী বলছে ইসরায়েল
ইসরায়েল আগে থেকেই বলে আসছিল, ‘ইরান ও তার মিত্র’দের হামলার জবাব দিতে হামলা করা হবে। এ হামলার সময় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ড্যানিয়েল হ্যাগারি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইরানের সরকার এবং তাদের সহযোগীরা ৭ অক্টোবরের পর থেকে ক্রমাগতভাবে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার ও কর্তব্য রয়েছে ইসরায়েলের।’ প্রসঙ্গত, গাজা ও লেবাননে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি অক্টোবর মাসের শুরুতে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে ইরান।
ইরানের জনগণের প্রতিক্রিয়া
যদিও এ হামলার সময় কিছু মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন। কিন্তু রাত ২টা থেকে বিস্ফোরণের ক্রমাগত শব্দে লাখ লাখ মানুষ আতঙ্কে জেগে থাকেন। ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া নানা পোস্টে দেখা যায়, কী ঘটছে তা জানতে চেষ্টা করছেন সেখানকার মানুষ। তেহরানের ৩২ বছর বয়সী যুবক আলী আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এটা যে অপ্রত্যাশিত তা নয়। কিন্তু এটা খুব আতঙ্কজনক।’
ইরান কি প্রতিশোধ নেবে
বিশ্লেষকেরা বলছেন, গতকালের হামলায় ক্ষতির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। আর তাই এ হামলার দ্রুত জবাব না দেওয়ার একধরনের ‘এড়িয়ে যাওয়ার যুক্তিসংগত পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে ইরানের পক্ষে। হয়তো ফিরতি হামলার দিকে যাবে না তারা।
তবে সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, সামরিক বাহিনীর চার সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনার ফলে এর জবাব দেওয়ার একটি পথ সৃষ্টি হয়েছে।
আর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তো বলেই দিয়েছে, এ হামলার জবাব দেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে এই পাল্টা হামলার ধরন ও সময় কখন হবে, তা এখনো অস্পষ্ট।
ইসরায়েলও হুঁশিয়ার করে বলেছে, জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা ‘সাড়া দিতে বাধ্য’ এবং তাদের নাগালে আরও লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেখানে হামলা করা সম্ভব।