বাংলাদেশের প্রকল্পে দুর্নীতি-সংশ্লিষ্ট তদন্তে উঠে এসেছে যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার দলীয় মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের নাম। তিনি ও তার খালা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাদের পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে ৪০০ কোটি ডলার ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে।
টিউলিপ সিদ্দিক যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিসভার সদস্য। তিনি ইকোনমিক সেক্রেটারি টু দ্য ট্রেজারি অ্যান্ড সিটি মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার কাজ যুক্তরাজ্যের অর্থবাজারের ভেতরের দুর্নীতি সামাল দেওয়া। এখন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ব্রিটেনে বেশ চাপের মুখে আছেন টিউলিপ।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য টিউলিপের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি। কিন্তু তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। লেবার পার্টিও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের ববি হাজ্জাজ নামে একজনের একগুচ্ছ অভিযোগের ভিত্তিতে ওই তদন্ত করা হয়েছে। টিউলিপের মা শেখ রেহানা সিদ্দিকসহ তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য এবং শেখ হাসিনার সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তদন্তের আওতায় আছেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ও।
বিবিসির হাতে আসা আদালতের নথিতে দেখা যায়, ববি হাজ্জাজ, টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাশিয়া সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের মধ্যস্থতা ও সমন্বয়ের অভিযোগ আনেন। নথি অনুসারে, অনিয়মের ৩০ শতাংশ অর্থ ব্যাংক এবং বিদেশি সংস্থাগুলোর একটি জটিল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে টিউলিপ এবং তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের ফুটেজে দেখা গেছে, রাশিয়ার ক্রেমলিনে শেখ হাসিনা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে টিউলিপ সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি সইয়ের সময় তিনি সরকারি প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ক্রেমলিনে যান। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে যুক্তরাজ্যের বিরোধী দলের নেতাদের সরব হতে দেখা গেছে। তারা টিউলিপের মন্ত্রী পদে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।
স্থানীয় সময় গত বুধবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল এ-সংক্রান্ত এক বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, মন্ত্রী টিউলিপের ওপর ব্রিটেনের আর্থিক খাতের দুর্নীতি দূরীকরণের দায়িত্ব ন্যস্ত থাকলেও তার বিরুদ্ধেই বাংলাদেশে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত চলছে।
হাইকোর্টের কাছে অভিযোগ পৌঁছেছে যে, টিউলিপ সিদ্দিক সম্ভবত রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির মধ্যস্থতায় ছিলেন। সব মিলিয়ে ওই চুক্তির আর্থিক মূল্য ছিল ১০ বিলিয়ন বা ১ হাজার কোটি ডলার। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত কোম্পানি রোসাটম।
এ নিয়ে টিউলিপের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে ডেইলি মেইল। এ সময় তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। টিউলিপের পারিবারিক বন্ধু ও হাসিনার দল আওয়ামী লীগের যুক্তরাজ্য শাখার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফারুক বলেন, এসব অভিযোগ ‘বানোয়াট’। এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এটা ছাড়াও মন্ত্রী হওয়ার পর টিউলিপের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে আরেকটি তদন্ত হয়েছে। দ্য মেইলের প্রতিবেদন জানায়, টিউলিপ ১৪ মাস ধরে লন্ডনে তার সম্পদের আয়ের তথ্য গোপন করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ২৮ দিনের মধ্যেই এসব আয়ের তথ্য প্রকাশ করতে হয়। এর আগে একই পত্রিকা খবর প্রকাশ করে, পাঁচ কক্ষের ২০ লাখ পাউন্ডের একটি বাড়িতে টিউলিপ উঠেছেন। এ ক্ষেত্রে খালা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মিত্রতাকে কাজে লাগান তিনি।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে দুর্নীতি প্রসঙ্গে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, যে ১ হাজার কোটি ডলার ঘুষের অভিযোগ উঠেছে, সেই অর্থের ৯০ শতাংশই ছিল ক্রেমলিনের কাছ থেকে তৎকালীন হাসিনা সরকারের ঋণ। এরই মধ্যে ৪০০ কোটি ডলার মালয়েশিয়ার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে।
টিউলিপের এমন অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী রক্ষণশীল দলের সংসদ সদস্য জো রবার্টসন। তিনি বলেন, ‘এটা পরিষ্কার যে, জটিল কিছু প্রশ্ন উঠেছে– যেগুলোর জবাব প্রয়োজন। আসলে ঘটনার সঙ্গে মন্ত্রীর (টিউলিপ) সম্পর্ক কোথায়?’ এ রকম অভিযোগ নিয়ে তিনি পদে থাকতে পারেন কি না, এমন প্রশ্নও তোলেন এ রাজনীতিক। টিউলিপের বিরুদ্ধে এ অভিযোগের বিষয়টি ব্রিটেনের বাঙালি কমিউনিটির মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার বিষয়।
বিরোধীরা চাপ দিলেও নিজ দলকে পাশে পেয়েছেন টিউলিপ। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ ডাউনিং স্ট্রিট থেকে এ-সংক্রান্ত বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী স্টারমারের আস্থা আছে টিউলিপের ওপর। এতে আরও বলা হয়, টিউলিপ এ ধরনের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে এখন আর মাথা ঘামান না।