সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করছে ইসরায়েল। বিশেষত, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি সেনার মুহুর্মুহু আক্রমণ করতে পারার পেছনে আধুনিক এই প্রযুক্তির অবদান রয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হয় যুদ্ধ। এই দ্বন্দ্বে এ পর্যন্ত ৪৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
অঞ্চলটিতে সূক্ষ্ম ও নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে ইসরায়েল ‘হাবসোরা’ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট। এই শক্তিশালী এআই টুলকে ‘দ্য গসপেল’ বলেও সম্বোধন করা হয়।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত অঞ্চলে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি মুহুর্তেই কয়েকশ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব।

গোয়েন্দা তৎপরতায় এআই
সাম্প্রতিক দ্বন্দ্বের অনেক আগেই গোয়েন্দা কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করে ইসরায়েল।
তবে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় এআই ব্যবহারের কারনে নীতিনির্ধারণ যন্ত্রনির্ভর হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেরই (আইডিএফ) বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষটিকে সময়ালোচনা করেছেন।
তাদের ভাষ্য, যন্ত্রনির্ভরতা বাড়ায় মানুষের জীবনের মূল্য কমে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে কার্নেগি এন্ডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের ঊর্ধতন কর্মকর্তা স্টিভেন ফেল্ডস্টেইন বলেন, ‘গাজায় যা হচ্ছে , আমরা খুবই শীঘ্রই বাকি বিশ্বে তার প্রতিফলন দেখতে পাব। আধুনিক যুদ্ধনীতিতে ভয়াবহ ও নেতিবাচক এই পরিবর্তন ইতোমধ্যেই সাধিত হয়েছে। এখন শুধু বাস্তবায়ন দেখার পালা।’
তার মতে আক্রমণ যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে আধুনিক মানুষের সহমর্মিতা অনুভব করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

আক্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণে এআই
আক্রমণের ক্ষেত্রে আইডিএফ এআই টুল শুধু ব্যবহার করছে তেমন না। নিয়মিত এই প্রযুক্তিকে বিভিন্ন মেশিন লার্নিংয়ের আওতায় এনে ক্ষুরধারও করছে।
হাবসোরা টুলটি বিপুল পরিমান ব্যক্তিগত তথ্য ও স্যাটেলাইট ছবি পর্যবেক্ষণে সক্ষম হওয়ায় ইসরায়েলি সেনারা সহজেই তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু নিরূপণ করতে পারছেন।
এ ধরনের আরেকটি টুল ‘ল্যাভেন্ডারের’ মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য পর্যবেক্ষণ করে একজন সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না এ বিষয়ে ধারণা করছে আইডিএফ।
তবে অভ্যন্তরীণ গবেষণায় এ আই এর বেশ কিছু খামতিও উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রযুক্তি আরবির বিভিন্ন পরিভাষা ও আঞ্চলিক ভাষাগত পরিবর্তন ঠিকঠাক ধরতে পারছে না।
এ বিষয়ে ইসরায়েলের এক সাবেক ঊর্ধতন কর্মকর্তার মত, লক্ষ্য নির্ধারণে কাজে লাগলেও মানুষের প্রেক্ষাপটগত পরিবর্তনগুলো বুঝতে না পারায় বিপক্ষ শক্তির পদক্ষেপ সমন্ধে সর্বক্ষণ ওয়াকিবহাল থাকতে পারছে না আইডিএফ।

প্রাণনাশে নাটকীয় ঊর্ধ্বগতি
এআই ব্যবহারের পর থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসামরিক নাগরিক মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২০১৪ সালে সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি সদস্য হামলায় একজনের বেশি বেসামরিক নাগরিক মারা গেলে অভ্যন্তরীণ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো সামরিক বাহিনীকে। তবে ঠিক দশ বছর পর এই সংখ্যা বেড়ে ১৫তে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ একজন নিম্নস্তরীয় হামাস নেতাকে হামলা করতে গিয়ে ১৫ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হলেও কোনো বিচার হবে না ইসরায়েলের।
এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে এআই-এর ভূমিকা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে আক্রমণের ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার সমর্থন করে জুয়িশ ইস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অব আমেরিকার সদস্য ব্লেইজি মিৎসোয়াল বলেন, ‘প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলেই ইসরায়েল এখনো নিরাপদ আছে।’

আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
সামরিক কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমতার আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করায় আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে ইসরায়েল। সমালোচকদের ভাষ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারনে মানব বিচারবোধ আরও নিম্নগামী হবে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সেনাকর্মকর্তাদের প্রভাবও কমবে বলে মত তাদের।
মানব হত্যায় ইসরায়েলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে শঙ্কিত জাতিসংঘ। সম্প্রতি সমালোচনার মুখে আইডিএফের গোয়েন্দা সংস্থার ইউনিট-৮২০০ প্রধান আস ইওসি সারিয়েল পদত্যাগ করেছেন।
উদ্ভূত এই জটিল পরিস্থিতি ইসরায়েলে কীভাবে সামলাবে- তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে ইসরায়েল প্রযুক্তি ও মানবীয়-নৈতিক দায়বদ্ধতার সামঞ্জস্য করতে পারে কি না-এটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আশা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
নাইমুর/