ইউক্রেনে গত ১০ দিনে ড্রোন ও বিমান হামলায় ৪৭ জন বেসামরিক মানুষ মারা গেছেন। তবে এসব ঘটনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়।
ওয়াশিংটনে ওভাল অফিসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে হওয়া বাদানুবাদ নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছেন সবাই। বিষয়টির সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।
হোয়াইট হাউসে যে ঘটনা ঘটেছে, তা জেলেনস্কির জন্য সুখকর নয়। তার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল ইউক্রেন। তারা বুঝেই উঠতে পারছিল না যে তাদের কী আসলে ক্ষিপ্ত হওয়া উচিত, না কি আতঙ্কিত হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা উচিত।
টেলিগ্রাম অ্যাপে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর চ্যানেল ফুঁসে ওঠে ওই ঘটনার পরপরই। সেখানে ইউক্রেনের বাহিনী জানিয়ে দেয়, তারা দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করে মরবেন, তবু মাথা নত করবেন না। তবে তাদের পায়ের নিচের মাটি যে নড়বড়ে হয়ে গেছে, তা তারা ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন।
হোয়াইট হাউসে যা হয়েছে, তার আপাতত কোনো সমাধান নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এটির সমাধানে আমাদের কিছুই করার নেই।’ রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, জেলেনস্কির উচিত দ্রুত এটা ঠিকঠাক করা, আর না হয় সরে দাঁড়ানো।
গত শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) জেলেনস্কির ওয়াশিংটনে চুক্তি স্বাক্ষর করার কথা ছিল, যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। সেগুলো প্রায় হয়েও যাচ্ছিল। কিন্তু ওভাল অফিসে বাদানুবাদের পর সবই ভণ্ডুল হয়ে যায়। পুরো পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন জেডি ভ্যান্স। তার কথাবার্তা থেকেই পুরো বিষয়টির সূত্রপাত।
জেলেনস্কি পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের কাছে ক্ষমা চাইবেন না। তবে তার মনে হয় যে চাইলে এ সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব। সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্প ও ভ্যান্স কখনোই যুদ্ধকে সামনে থেকে দেখেননি। তবে তারা এটির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং তাদের মনে হয়েছে যে তিন বছর ধরে যুদ্ধের মধ্যে থাকা জেলেনস্কিকে শান্তিসংক্রান্ত ইস্যুতে লেকচার দেওয়া উচিত।
বর্তমানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে জেলেনস্কির সামনে তিনটি পথ খোলা আছে। এক. তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। দুই. যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়াই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ও টিকে থাকার পথ খুঁজে বের করতে হবে। আর তিন. তার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে এবং নতুন কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে। তৃতীয় পথটি সম্ভবত সবচেয়ে সহজ পথ।
তবে জেলেনস্কি যদি এখন ক্ষমতা থেকে সরে যান (যেটি মস্কোও চায়), তাহলে ফ্রন্টলাইনে সংকট দেখা দেবে, রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং কিয়েভ সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। ফলে প্রকৃত অর্থে সামনে কোনো ভালো রাস্তা খোলা নেই কিয়েভের।
লন্ডন, প্যারিস, মিউনিখের স্বস্তিদায়ক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে ইউরোপের সুরক্ষা আপাতত ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে। ফলে তারা ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করে এমন কোনো পদক্ষেপ নাও নিতে পারে। কিন্তু কিয়েভের জন্য হিসাবটা আলাদা। তাদের তিন বছর ধরেই ড্রোন হামলার মুখে রাত পার করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে জেলেনস্কির ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে ইউক্রেনীয়রা হতাশ হলেও যুদ্ধ চালিয়ে যেতে তারা দ্বিধা করবেন না।
হয়তো এ বিষয়টিই জেলেনস্কিকে সাহস জুগিয়েছে জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যের কড়া জবাব দিতে। এ প্রসঙ্গে এক ইউক্রেনীয় বলেছেন, ‘মর্যাদাও মূল্যবান। রাশিয়া যেখানে এটি ভাঙতে পারেনি, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র কেন ভাবছে যে তারা পারবে?’ সূত্র: সিএনএন।