ভারতের সংসদে সদ্য পাস হওয়া ওয়াকফ বিল নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তীব্র আপত্তি দেখা গেছে। বিশেষ করে কংগ্রেস এই বিলকে ‘মুসলিমবিরোধী’ এবং ‘অসাংবিধানিক’ বলে অভিহিত করেছে। তারা খুব শিগগিরই ওয়াকফ (সংশোধনী) বিলের সাংবিধানিক বৈধতাকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করবে। গতকাল শুক্রবার কংগ্রেসের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু।
এ বিষয়ে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য জয়রাম রমেশ বলেছেন, ‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস খুব শিগগিরই সুপ্রিম কোর্টে ওয়াকফ (সংশোধনী) বিলের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করবে। আমরা আত্মবিশ্বাসী এবং ভারতের সংবিধানে থাকা নীতি, বিধান এবং অনুশীলনের ওপর মোদি সরকারের সব আক্রমণ প্রতিহত করে যাব।’
মূলত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশজুড়ে মুসলমানদের দান করা কোটি কোটি ডলার মূল্যের সম্পত্তির ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিতে আইনে এই পরিবর্তন আনা হয়। বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মধ্যে নিম্নকক্ষে বৃহস্পতিবার এটি পাস হওয়ার এক দিন পর শুক্রবার উচ্চকক্ষও এই বিল পাস করে।
ইসলামী ঐতিহ্যে, ওয়াকফ হলো সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য মুসলমানদের প্রদত্ত একটি দাতব্য বা ধর্মীয় দান। এ ধরনের সম্পত্তি বিক্রি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান এবং এতিমখানার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয় বলে ভারতের ২০ কোটি মুসলমানের কাছে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পত্তিগুলো এখন পর্যন্ত ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। এর অধীনে এগুলো পরিচালনার জন্য রাজ্যস্তরের বোর্ড রয়েছে। এই বোর্ডগুলোতে রাজ্য সরকারের মনোনীত ব্যক্তি, মুসলিম আইনপ্রণেতা, রাজ্য বার কাউন্সিলের সদস্য, ইসলামি পণ্ডিত এবং ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপকরা থাকেন।
গত আগস্টে বিজেপি সরকার ওয়াকফ আইন সংশোধনের জন্য একটি বিল পেশ করে। তারা বলেছে, বিলের প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো ওয়াকফ প্রশাসনকে আধুনিকীকরণ করবে এবং আইনি ফাঁকফোকর কমাবে। কিন্তু মুসলিম নেতা এবং বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, এই সংশোধনীগুলো সরকারকে সম্পত্তিগুলোর ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ দেবে। বিলটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি প্যানেলে পাঠানো হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে প্যানেল কিছু সংশোধনীসহ বিলটি অনুমোদন করে।
বিলের প্রতিবাদে কলকাতা-চেন্নাইয়ে বিক্ষোভ:
ভারতের লোকসভায় বিতর্কিত মুসলিম ওয়াকফ সংশোধনী বিল পাসের প্রতিবাদে শুক্রবার কলকাতা, চেন্নাই ও আহমেদাবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। জুমার নামাজ শেষে মুসলিম সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীরা জাতীয় পতাকা ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে ‘ওয়াকফ সংশোধনী বিল প্রত্যাখ্যান’ স্লোগান দেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ খবর জানিয়েছে।
কলকাতায় ‘জয়েন্ট ফোরাম ফর ওয়াকফ প্রোটেকশন’-এর ডাকে বিক্ষোভ হয়। বার্তা সংস্থা এএনআইর ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভস্থলে উন্মুক্ত স্থানে জমায়েত হয়ে বক্তারা বিলটির বিরোধিতা করেন। আহমেদাবাদে পরিস্থিতি বেশি উত্তপ্ত ছিল। পুলিশ সেখানে রাস্তায় অবস্থান নেওয়া বয়োজ্যেষ্ঠ বিক্ষোভকারীদের জোর করে সরানোর চেষ্টা করে। অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) গুজরাট শাখার প্রধানসহ ৪০ জনকে আটক করা হয়।
চেন্নাইয়ে অভিনেতা বিজয়ের তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম (টিভিকে) রাজ্যব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দেন। চেন্নাই, কোয়েম্বাটুর ও তিরুচিরাপল্লিতে টিভিকে কর্মীরা ‘ওয়াকফ বিল প্রত্যাখ্যান’ ও ‘মুসলিমদের অধিকার কেড়ো না’ স্লোগান দেন। আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে ‘ডার্ক হর্স’ হিসেবে দেখা হচ্ছে বিজয়কে। তিনি এ বিলকে ‘গণতন্ত্রবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
লখনউতেও উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (সেন্ট্রাল লখনউ) আশীষ শ্রীবাস্তব বলেন, ‘আমরা সবাইকে বিলটি ভালোভাবে পড়ে মতামত দিতে বলেছি। সোশ্যাল মিডিয়া নিয়মিত মনিটর করছি আমরা।’
পশ্চিমবঙ্গে আগামী বছর নির্বাচনের মুখে এই বিক্ষোভ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোমধ্যে বলেছেন, তিনি রাজ্যের মুসলিমদের জমি হারাতে দেবেন না। বিজেপিকে দেশ বিভক্ত করার চেষ্টার অভিযোগ এনে তিনি বলেছেন, নতুন অ-বিজেপি সরকার কেন্দ্রে গঠিত হলে এই বিল বাতিল করা হবে।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান উদ্বেগ, নতুন ওয়াকফ আইন প্রযোজ্য হলে তা বিদ্যমান সম্পত্তিগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়কমন্ত্রী কিরেন রিজিজু পার্লামেন্টে বলেছেন, আইনটি ভবিষ্যতের জন্য প্রযোজ্য হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও তাকে সমর্থন জানিয়েছেন।
পার্লামেন্টে তীব্র বিতর্ক: কংগ্রেস সংসদ সদস্য সোনিয়া গান্ধী এই বিলকে সংবিধানের ওপর ‘স্পষ্ট আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বিজেপি সমাজকে ‘স্থায়ীভাবে বিভক্ত’ রাখতে চায়। বিজেপি তার এই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে।
পার্লামেন্টে এই বিল নিয়ে তীব্র বাগবিতণ্ডা হয়। রাজ্যসভায় রেকর্ড ১৭ ঘণ্টা ২ মিনিট এবং লোকসভায় ১২ ঘণ্টার বেশি আলোচনা হয়।
কী এই ওয়াকফ?
আসলে মুসলিমরা তাদের সম্পত্তির কিছুটা অংশ ধর্মীয় কাজকর্মে ও মুসলিম সম্প্রদায়ের উন্নতির জন্য দান করে থাকেন। খুব সহজ করে বললে এটাই হলো ওয়াকফ। এই সম্পত্তির আয় থেকে মসজিদের খরচ চালানো হতে পারে, শিক্ষার কাজে ব্যবহার হতে পারে, অনাথদের সাহায্য করা হতে পারে। আর ওইসব সম্পত্তি পরিচালনা করার জন্যই রয়েছে ওয়াকফ বোর্ড।
বর্তমান ওয়াকফ আইন অনুযায়ী, ওয়াকফ বোর্ডের দখল করা সম্পত্তি বা জমিতে কোনো রকম সরকারি পর্যালোচনা করা যায় না। পর্যালোচনা ছাড়াই ওয়াকফ বোর্ড জমি দখল করতে পারে। কোনো সম্পত্তি নিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ওয়াকফ বোর্ডের আইনি বিবাদ চললেও তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না সরকার। কোনো সম্পত্তি নিয়ে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ওয়াকফ বোর্ডের আইনি বিবাদ চললেও তাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না সরকার।
সরকার এই আইনেই মূলত বদল আনছে। বিতর্কিত কোনো সম্পত্তির মালিকানা আদতে কার, তাও খতিয়ে দেখার আইনি এখতিয়ার সরকার নিজের নিয়ন্ত্রণেই রাখতে চাইছে। নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের সেই একচ্ছত্র অধিকার থাকবে না। কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে জেলাশাসক বা সমপদমর্যাদার কোনো আধিকারিকের হাতে।
আসলে ওয়াকফ দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলো, সম্পত্তির দেখাভাল ও তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন জনসাধারণ। অন্যটি হলো, কোনো সম্পত্তি ওয়াকফ করে দেওয়া হলো তবে তার দেখাভাল করবেন সম্পত্তি দানকারীই। পুরোনো আইনেই তা বলা রয়েছে। তা এবার সংশোধন করতে চলেছে কেন্দ্র। গোটা দেশে মোট ৮ দশমিক ৭ লাখ ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে। ভারতীয় রেল ও সেনাবাহিনীর পরই দেশে ওয়াকফের বেশি সম্পত্তি রয়েছে।
নতুন আইনে যা যা পরিবর্তন আসবে
প্রথমত, ওয়াকফ থেকে ট্রাস্টকে পৃথক করা, মুসলিমদের তৈরি কোনো ট্রাস্ট কোনো আইনে ওয়াকফ বলে বিবেচ্য হবে না। ট্রাস্টের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েম হবে। ওয়াকফ ঘোষণার আগে নারীদের উত্তরাধিকার সম্পত্তি দান করে দিতে হবে। এর মধ্যে বিধবা, বিবাহবিচ্ছিন্না এবং অনাথ নারীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্ম পালনকারী মুসলিমরাই একমাত্র তাদের সম্পত্তি ওয়াকফ করতে পারবেন। সেই সঙ্গে ওয়াকফ সম্পত্তি রেজিস্ট্রেশন করার পদ্ধতির বদল।
কোনো সরকারি সম্পত্তি যদি কেউ ওয়াকফ বলে দাবি করেন, তাহলে তার তদন্ত করতে পারবেন কালেক্টরের ওপরের ব়্যাঙ্কের কোনো অফিসার। ওয়াকফ সম্পত্তির আয় যদি ১ লাখ টাকার ওপরে হয়, তাহলে সেই আয়ের অডিট করাতে হবে। ওই অডিট করবেন রাজ্যের অডিটররা।
ওয়াকফ সম্পত্তির বর্ণনা থাকবে একটি সেন্ট্রালাইজড পোর্টালে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের ওয়াকফ বোর্ডে দুজন অমুসলিম প্রতিনিধি থাকবেন। এবং অবশ্যই যেকোনো সম্পত্তিতে ওয়াকফ বলে ঘোষণা করা যাবে না।