দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হয়েছেন দেশটির বিরোধী দলের নেতা ।
শৈশবে দারিদ্র্য থেকে উঠে আসা দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় এই উদার রাজনীতিবিদ বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তার মেয়াদ শুরু করেন ।
পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে তা সামাল দেওয়াই এখন লি জে-মিয়ংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।যদিও লির জয় দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে তাৎক্ষণিকভাবে কোন বড় পরিবর্তন আনবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সমালোচকরা বলছে, চীন ও উত্তর কোরিয়ার দিকে ঝুঁকে থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান থেকে দূরে থাকা লি হয়ত দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিত্রতার উপর জোর দেবেন।
বুধবার (৪ জুন) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, দক্ষিণ কোরিয়ায় কয়েক মাস ধরে চলা রাজনৈতিক সংকট ও বিশৃঙ্খলার পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছেন বিরোধী নেতা লি জে-মিয়ং। গত বছরের শেষের দিকে হঠাৎ করে সামরিক আইন জারির সিদ্ধান্তের কারণে এপ্রিলে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইউন সুক ইওলকে অপসারণের মাধ্যমে আকস্মিক নির্বাচনে জয়লাভের একদিন পর তিনি এই মেয়াদ শুরু করেন।
জাতীয় পরিষদে তার উদ্বোধনী ভাষণে লি বলেন, ‘ আমার সরকার দক্ষিণ কোরিয়া-মার্কিন সামরিক জোটের উপর ভিত্তি করে ‘শক্তিশালী প্রতিরোধ’ দিয়ে সম্ভাব্য উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসন মোকাবেলা করবে।’
তবে তিনি উত্তর কোরিয়ার সাথে একটি যোগাযোগের চ্যানেল খুলবেন এবং আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন বলে জানান।
মূলত এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের সামরিক শাসন জারির চেষ্টায়। তার এই স্বল্পস্থায়ী ও চরম বিতর্কিত সেই পদক্ষেপ দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্ট তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। বর্তমানে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
মূলত এই ঘটনাগুলোর পর দেশজুড়ে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়, তা সামাল দেওয়াই এখন লি জে-মিয়ংয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি এমন একটি সময় দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন দেশ অভ্যন্তরীণভাবে তীব্রভাবে বিভক্ত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাকে কঠিন কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে হবে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি পুনরায় আলোচনা করে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর শুল্কের চাপ কমাতে হবে।
এদিকে নির্বাচনে মিয়ংয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ক্ষমতাসীন পিপল পাওয়ার পার্টির (পিপিপি) প্রার্থী কিম মুন-সু। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওলের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন জরিপে পিছিয়ে থাকা কিম নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল দেখে বুধবার( ০৪ জুন) ভোরে পরাজয় স্বীকার করেন এবং লিকে বিজয়ী হিসেবে অভিনন্দন জানান।
এদিকে, লি নিজের বক্তব্যে সরাসরি জয় ঘোষণা না করলেও ইঙ্গিত দেন, তিনি জিতেছেন। তিনি বলেন, 'তার প্রথম কাজ হবে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা।'
৬১ বছর বয়সী এই রাজনীতিক মাত্র তিন বছর আগে খুব অল্প ভোটে ইউনের কাছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। ফলে এটি তার জন্য এক অসাধারণ প্রত্যাবর্তন।
তবে লি নিজেও একাধিক রাজনৈতিক বিতর্ক ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত হয়েছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কেলেঙ্কারিও তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে অনেক ভোটার লি জে-মিয়ংয়ের প্রতি বিশেষ সমর্থন দেখাতে নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতেই বিকল্প হিসেবে তাকে ভোট দিয়েছেন।
সুলতানা দিনা/