মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানের রাজধানী তেহরানে পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাকে মূল লক্ষ্যবস্তু করে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
ইরানের স্থানীয় সময় শুক্রবার (১৩ জুন) ভোর ৪টার দিকে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
ইসরায়েলের ২০০ যুদ্ধবিমান ইরানের ১০০ লক্ষ্যবস্তুতে (স্থাপনা) হামলা চালায়। হামলায় ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
অন্যদিকে ইরানও শুক্রবার পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে ও জেরুজালেমে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে জবাব দিয়েছে ইরান।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু স্থাপনা ও অন্যান্য সামরিক ঘাঁটি। তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের কাছে এত বেশি পরিমাণে পরমাণু উপাদান মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা কয়েক দিনের মধ্যেই পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারত।’
ইসরায়েলের হামলার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি বলেছেন, এই হামলা ইসরায়েলের ‘বর্বর স্বভাবের প্রমাণ’। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘এই হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল নিজেই নিজের জন্য একটি করুণ পরিণতির পথ তৈরি করেছে, যার ফলাফল তারা নিশ্চিতভাবেই ভোগ করবে।’ সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, ইসরায়েলে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসরায়েলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আয়রন ডোম থেকে সেই হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। হামলার ফলে সেখানে ধোঁয়ার কুণ্ডলি উঠতে দেখা গেছে। ইরানের একজন সিনিয়র মন্ত্রী বলেছেন, ‘বিশ্বের কোথাও ইসরায়েলিরা নিরাপদ থাকবে না। আমাদের প্রতিশোধ হবে বেদনাদায়ক। আমাদের কমান্ডার, পরমাণু বিজ্ঞানী ও সাধারণ মানুষ হত্যার জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতেই হবে।’
ইরানি গণমাধ্যম দাবি করছে, ইরানের রাজধানী তেহরানের আবাসিক এলাকাগুলোতে বিস্ফোরণ হয়েছে এবং নিহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষও রয়েছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরজুড়ে বিস্ফোরণের চিহ্ন, ধ্বংসস্তূপ আর আতঙ্কের চিত্র ফুটে ওঠে।
হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরি, রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার হোসেইন সালামিসহ ২০ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও অন্তত ছয়জন পরমাণু বিজ্ঞানীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ইরান।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির কেন্দ্রে আঘাত হানা হয়েছে।’ রাজধানী তেহরান থেকে ২২৫ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর নাতাঞ্জ এলাকায় পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর কথা জানান তিনি। এটিকে পরমাণু সমৃদ্ধকরণের মূল এলাকা হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইরানি বোমা বানানোর সঙ্গে জড়িত’ বিজ্ঞানীরা তাদের নিশানায় রয়েছেন। যতদিন প্রয়োজন, ততদিন এ হামলা অব্যাহত থাকবে।
ইরানি সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, দেশটির প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জসহ কয়েকটি স্থানে বিস্ফোরণ ঘটেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম নুর নিউজ বলছে, ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ৭৮ জন নিহত ও ৩২৯ জন আহত হয়েছেন। ইরানে হামলার পর পরই ‘পাল্টা হামলার শঙ্কায়’ নিজ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছে ইসরায়েলি সরকার। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডিফ্রিন জানিয়েছেন, ইসরায়েলি ভূখণ্ডের দিকে ১০০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। সব ইরানি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত করা হয়েছে।
সংবাদদাতারা বলছেন, এর আগে ইরান ও ইসরায়েলের মাঝে পাল্টাপাল্টি হামলা দেখা গেলেও ইরানের মাটিতে এমন সরাসরি সামরিক অভিযান ইরান-ইরাক যুদ্ধের পর এবারই প্রথম ঘটল।
এদিকে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। না হলে আরও ‘ভয়াবহ হামলার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
তেল আবিব বলছে, তেহরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযানের শুরু হিসেবে এই হামলা চালাল তাদের সামরিক বাহিনী।
হামলা শুরুর কিছুক্ষণ পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমরা ইসরায়েলের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণ আগে শুরু হয়েছে ইসরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’। আমাদের এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ইরানি হুমকি প্রতিরোধ করা। যতদিন না এই হুমকি বন্ধ হচ্ছে, ততদিন এ অভিযান চলবে।”
২০ সামরিক কর্মকর্তা ও ৬ পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত
ইসরায়েলের হামলায় ইরানে ২০ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও ৬ পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। যাদের নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেছে তারা হলেন ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ বাঘেরি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান কমান্ডার হোসেইন সালামি, খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টারের কমান্ডার। ১৯৮০ সালে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডে যোগ দিয়েছিলেন বাঘেরি। পর্যায়ক্রমে তিনি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা হয়ে ওঠেন।
পরমাণু বিজ্ঞানীদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম ফেরেয়দুন আব্বাসি। তিনি ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এইওআইয়ের সাবেক প্রধান ছিলেন। আরও নিহত হয়েছেন মোহাম্মদ মাহদি তেহরানচি। তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তেহরানের ইসলামিক আজাদ ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন আব্দোলহামিদ মিনৌচেহর, আহমাদ রেজা জোলফাঘারি ও আমিরহোসেইন ফেকহি। তারা সবাই তেহরানের শহিদ বেহেশতি ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ছিলেন। নিহত ষষ্ঠ জনের পুরো নাম প্রকাশ করা হয়নি। শুধু তার পদবি ‘মোতাল্লেবিজাদেহ’ উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের ১০০ ড্রোন নিক্ষেপ
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডিফ্রিন জানিয়েছেন, ইসরায়েলি ভূখণ্ডের দিকে ১০০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। তারা সেগুলো প্রতিহত করেছেন। ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী, রেভল্যুশনারি গার্ড এবং ইমার্জেন্সি কমান্ডের কমান্ডার নিহত হওয়ার কথাও জানান তিনি। ওই হামলার পর পরই পাল্টা হামলার শঙ্কায় নিজ দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে ইসরায়েলি সরকার।
পরমাণু আলোচনা স্থগিত করল ইরান
সামরিক এবং পরমাণু স্থাপনায় ইসরায়েলের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু আলোচনা স্থগিত করেছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও ওমান নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন টাইমস অব ওমান।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি বলেছেন, ইসরায়েলের হামলায় কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে, যা ইরানি কূটনীতিকদের সঙ্গে আমেরিকানদের মধ্যে চলমান ছিল। এসলামি আরও বলেন, বর্তমানে ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় ফেরার কোনো সিদ্ধান্ত নেই, কারণ ইরান মনে করে এই হামলা আমেরিকার সহায়তায় সংঘটিত হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের দূতাবাস বন্ধ
ইরানে হামলার পর ইসরায়েল বিশ্বব্যাপী তাদের সব দূতাবাস বন্ধ করে দিচ্ছে। নাগরিকদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং জনসমাগম এলাকায় কোনো ইহুদি বা ইসরায়েলি প্রতীক প্রদর্শন না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের দূতাবাসের ওয়েবসাইটে শুক্রবার পোস্ট করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ইসরায়েল তাদের বৈদেশিক সব মিশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিচ্ছে এবং কনস্যুলার সেবাও আপাতত দেওয়া হবে না। ইসরায়েলি নাগরিকরা বৈরী কোনো তৎপরতার মুখোমুখি হলে তারা যেন স্থানীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা নেই: রুবিও
ইরানে ইসরায়েলের হামলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ইসরায়েলে সম্পূর্ণ নিজস্ব সিদ্ধান্তে এই হামলা চালিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে যেন হামলা না করা হয়, সে জন্য ইরানকে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি।
গতকাল এক বিবৃতিতে রুবিও বলেছেন, ‘আমরা ইরানে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই এবং আমাদের প্রধান মনোযোগের বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে অবস্থানরত সেনাদের নিরাপত্তা। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও সেনাদের আঘাত করা একেবারেই উচিত হবে না ইরানের জন্য।
চার দেশের আকাশসীমা বন্ধ
ইরানের ওপর হামলার পর পরই ইসরায়েল, ইরান, জর্ডান ও ইরাক- চার দেশই তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং সব ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। ফ্লাইট ট্র্যাকিং সাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর ওয়েবসাইটে এই দেশগুলোর আকাশ পুরোপুরি ফাঁকা দেখা গেছে। একটি ফ্লাইটও চলাচল করছে না। এয়ার ফ্রান্স জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত তেল আবিবে আসা-যাওয়ার সব ফ্লাইট বন্ধ থাকবে।
খাদ্য ও পানি মজুত করছে ইসরায়েলিরা
তেহরানে হামলার জবাবে ইরানও ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালাতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে জেরুজালেমের সুপারশপগুলোয় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে খাদ্য ও পানি। মজুত করার জন্য মানুষ এখন এগুলো হুমড়ি খেয়ে কিনছে।
গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে সাইরেনের শব্দ ও মোবাইলের সতর্কবার্তায় ঘুম ভাঙে ইসরায়েলের জনগণের। দেশটির সরকারের তরফ থেকে মানুষকে জানানো হয়, তাদের সামনে একটি ‘গুরুতর হুমকি’ রয়েছে। তাই সবাই যেন আশ্রয়কেন্দ্রের কাছাকাছি স্থানে অবস্থান করে।
ইসরায়েলের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, সারা দেশে রক্ত সংগ্রহের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে এবং যেসব রোগী বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতো কিছুটা সুস্থ, তাদের ছেড়ে দিচ্ছে ইসরায়েলের হাসপাতালগুলো।