যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের যে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তার জবাব দিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গত মঙ্গলবার ইরানি নেতাকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছিলেন ট্রাম্প। গতকাল বুধবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক বিবৃতিতে খামেনি বলেন, ‘ইরানিরা আত্মসমর্পণ করে না।’
উল্টো তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই যুদ্ধে জড়িয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে হামলা চালায়, তাহলে তাদের ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ভোগ করতে হবে। ইরান জায়নিস্টদের সঙ্গে সমঝোতা করবে না।’
সংঘাতের ষষ্ঠ দিনে গতকাল ইরানে ইউরেনিয়াম সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন কেন্দ্র এবং অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোয় হামলা করা হয়েছে। ‘৫০টিরও বেশি বিমান’ দিয়ে পরিচালিত এই হামলার টার্গেট ছিল ইরানের দুটি সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন কেন্দ্র এবং বেশ কয়েকটি অস্ত্র তৈরির কারখানা। এসব কেন্দ্রের মধ্যে ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল ও উপকরণের কয়েকটি কেন্দ্রও রয়েছে। ইরানের রাজধানীর কাছে খোজির ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্থাপনা লক্ষ্য করে ইসরায়েল তাদের সর্বশেষ হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গতকাল ভোরের প্রথম ২ ঘণ্টায় ইরান দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তেল আবিবে বুধবারের হামলায় তারা হাইপারসনিক ফাতাহ ওয়ান মিসাইল ব্যবহার করেছে।
সংঘাতের এই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো শুরু করেছে।
বুধবার (১৮ জুন) ভোরে পূর্ব ইংল্যান্ডের রয়্যাল এয়ারফোর্স লেকেনহিথ থেকে অন্তত চারটি এফ-৩৫ বিমান ঘাঁটি ছেড়ে গেছে বলে জানা গেছে। বিমানগুলোর সঙ্গে একটি জ্বালানির ট্যাংকার বিমানও ছিল। মাটির গভীরে তৈরি স্থাপনায় হামলা চালাতে সক্ষম বি টু বোমারু বিমান ভারত মহাসাগরে একটি ঘাঁটিতে রাখা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এ ছাড়া গত তিন দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৩০টি মিলিটারি বিমান যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্পেন, স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ইরানিরা আত্মসমর্পণ করে না: খামেনি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, ‘ইরান, এর জনগণ এবং এর ইতিহাস সম্পর্কে জানা ব্যক্তিরা কখনোই এই জাতির সঙ্গে হুমকির ভাষায় কথা বলেন না। কারণ ইরানিরা আত্মসমর্পণ করেন না। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তার এই বক্তব্য পাঠ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে।’ খামেনি বলেন, ইহুদিবাদী শত্রুকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে এবং ইরান জাতি ও সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে তারা তা পাচ্ছে।
হস্তক্ষেপ অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হবে
ইরানি নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জানা উচিত যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপ সন্দেহাতীতভাবে তাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে। তিনি বলেন, ‘ইরানি জাতি চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ ও চাপিয়ে দেওয়া শাস্তির বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে এবং এই জাতি চাপের মুখে কারও কাছে আত্মসমপর্ণ করবে না। গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনাগুলো এমন সময় ঘটেছে, যখন ইরানের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় ছিল এবং ইরানের দিক থেকে কোনো সামরিক বা কঠিন পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত ছিল না।’ খামেনি বলেন, ‘অবশ্যই, শুরু থেকেই এটা সন্দেহ করা হতো যে জায়নবাদী (ইহুদিবাদী) সরকারের যেকোনো পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা ছিল এবং আমেরিকার কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে এই সন্দেহই দিন দিন জোরালো হচ্ছিল।’
ইরানে ইসরায়েলি ড্রোন ভূপাতিত
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন জানায়, গতকাল সকালে ইরানের ইস্ফাহান প্রদেশে সেনাবাহিনীর আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট একটি অত্যাধুনিক হেরমেস ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। আইডিএফের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘অভিযানের সময় বিমানবাহিনীর দূরনিয়ন্ত্রিত একটি ড্রোনকে লক্ষ্য করে সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র) ছোড়া হয়। এতে ড্রোনটি ইরানের আকাশসীমায় ভূপাতিত হয়েছে। তবে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি এবং এতে থাকা কোনো তথ্য ফাঁস হওয়ারও আশঙ্কা নেই।’
ইরানের দুটি সেন্ট্রিফিউজ কেন্দ্র আক্রান্ত
আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইরানের দুটি সেন্ট্রিফিউজ উৎপাদন কেন্দ্র ইসরায়েলি হামলায় আক্রান্ত হয়েছে। আইএইএ বলছে, তেহরান রিসার্চ সেন্টারের একটি ভবনে হামলা হয়েছে। এখানে অ্যাডভান্সড লেভেলের সেন্ট্রিফিউজ রটরস উৎপাদন ও পরীক্ষা করা হয়। এ ছাড়া কারাজে ইরান সেন্ট্রিফিউজ টেকনোলজি কোম্পানির (টিইএসএ) দুটি ভবন ধ্বংস হয়েছে। সেখানে সেন্ট্রিফিউজের বিভিন্ন উপকরণ উৎপাদন করা হয়। দুটি স্থাপনাই এর আগে ইরানের পরমাণু চুক্তির আওতায় আইএইএ পর্যবেক্ষণ করেছিল বলে জানিয়েছে।
সেন্ট্রিফিউজ হলো সেই যন্ত্র, যা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে। এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামই বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রও বানানো যায়।
ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার আছে: এরদোয়ান
ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে ইরানের আত্মরক্ষার অধিকার আছে বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিয়ে গতকাল তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা ইরানের খুবই স্বাভাবিক, বৈধ এবং আইনি অধিকার। তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা চালিয়ে নেতানিয়াহু নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারকেও ছাড়িয়ে গেছেন।
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান
ইসরায়েল লক্ষ্য করে এবার হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এ কথা জানিয়েছে। ইরানের দাবি, ‘ফাত্তাহ’ নামের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে সফলভাবে প্রবেশ করেছে। ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর বিবৃতির বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, ইসরায়েলের জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বরাত দিয়ে প্রেস টিভি জানিয়েছে, “আইআরজিসি অভিযানের সর্বশেষ পর্যায়কে ‘একটি টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছে প্রথম প্রজন্মের ফাত্তাহ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন ইসরায়েলের ‘কাল্পনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সমাপ্তির সূচনা।” ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার সময় ইরান কয়েক ডজন ফাত্তাহ-১ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল।
তিন ঘাঁটিতে ৩০টি যুদ্ধবিমান পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র
গত তিন দিনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপের কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটির উদ্দেশে উড়ে গেছে অন্তত ৩০টি যুদ্ধবিমান। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং সংস্থা ফ্লাইটরাডার ২৪-এর বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি। বিবিসির নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেসি-১৩৫ নামের বিমানগুলো নামে যুদ্ধবিমান হলেও সাধারণত এগুলোকে যুদ্ধে ব্যবহার করা হয় না। এগুলো মূলত ট্যাংকার বিমান; অর্থাৎ অপারেশনে ব্যবহৃত যুদ্ধ ও বোমাবাহী বিমানগুলোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। স্পেন, স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর উদ্দেশে এ বিমানগুলো উড়ে গেছে। সংঘাতের এই পরিস্থিতিতে মার্কিন ঘাঁটি থেকে তিন দিনে ৩০টি ট্যাংকার যুদ্ধবিমানের ইউরোপের সামরিক ঘাঁটির উদ্দেশে উড়ে যাওয়াকে ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’ বলে মনে করছেন একাধিক আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
ইরানে আবার হামলা শুরু ইসরায়েলের
ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফ জানিয়েছে, তাদের বিমানবাহিনী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা শুরু করেছে। ইরানের ইসলামিক রিভল্যুশনারি গার্ড বলেছে, তেহরানের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলীয় শহরতলিতে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
বিবিসি পার্সিয়ান সার্ভিস জানিয়েছে, ইরানের সংবাদমাধ্যম বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে খবর দিয়েছে। বিভিন্ন ছবিতে দেখা যাচ্ছে, উত্তর-পূর্ব তেহরানে বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া উড়ছে। কিছু সূত্র বলছে, তেহরানের লাভিজান এলাকাতেও বিমান হামলা হয়েছে। নিউজ সাইট তাবনাক জানিয়েছে, তেহরানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ ছাড়াও কারাজের বিভিন্ন এলাকায় হামলা করছে ইসরায়েল।
এদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, তেহরানে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর ঘোষণা দেওয়ার পর তাদের বিমানবাহিনী ইরানের ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সদর দপ্তর’ ধ্বংস করেছে। গতকাল এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এক বিবৃতিতে কাৎজ বলেন, ‘বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান ইরানের শাসকদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সদর দপ্তর ধ্বংস করে দিয়েছে, ইরানের শাসকের দমনের প্রধান অস্ত্র এটি।’ এএফপির একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, উত্তর তেহরানে নতুন করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
ইরানজুড়ে ‘ব্ল্যাক আউট’
ইরান ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। গত মঙ্গলবার বিকেল থেকেই ইরানের বিস্তীর্ণ অংশে ইন্টারনেট প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, ক্রমেই সম্পূর্ণ ‘ব্ল্যাক আউট’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইরান।
সংবাদমাধ্যম এনবিসির একটি প্রতিবেদন অনুসারে ইসরায়েলি হামলার কারণে নয়, বরং ইরান সরকারের সিদ্ধান্তেই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, ইসরায়েলি সাইবার হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে আপাতত সাময়িকভাবে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগেও ২০১৯ সালে ইরানে দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় শেষ বার ছয় দিনের ‘ব্ল্যাক আউট’ কার্যকর করা হয়েছিল।