২২ মাসের যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টার মধ্যেই গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আগামী কয়েক সপ্তাহে ৬০ হাজার রিজার্ভ সেনা ডাকবে ইসরায়েল। বুধবার (২০ আগস্ট) দখলদার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ তথ্য জানায়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল ক্যাটজ গাজার ঘনবসতিপূর্ণ কিছু এলাকায় অভিযান শুরুর পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন। এ কারণে ৬০ হাজার নতুন রিজার্ভ সেনা ডাকা হবে এবং আরও ২০ হাজার রিজার্ভ সেনার সেবার মেয়াদ বাড়ানো হবে।
এই ঘোষণা আসছে এমন সময়ে, যখন মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে—গাজায় মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। সেখানে অধিকাংশ মানুষ একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, অসংখ্য বসতি ধ্বংসস্তূপে পরিণত এবং ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের হুমকির মধ্যে অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
একজন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, নতুন যুদ্ধপর্বে ‘গাজা সিটি ও এর আশপাশে ধাপে ধাপে সুনির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান’ চালানো হবে। এর মধ্যে এমন কিছু এলাকা আছে, যেখানে আগে সেনারা প্রবেশ করেনি। কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই জেইতুন ও জাবালিয়া এলাকায় অভিযান শুরু হয়েছে।
সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরা জানায়, গাজার সবচেয়ে বড় শহর ‘গাজা সিটি’ দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারণে বাসিন্দারা এখন সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এই অভিযান লাখো মানুষকে দক্ষিণাঞ্চলের তথাকথিত ‘কনসেন্ট্রেশন জোনে’ ঠেলে দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলি কামানের গোলায় পূর্ব গাজা সিটির সারি সারি ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলা তীব্রতর হয়েছে।
গাজার বাসিন্দা আবু আজযুম বলেন, ‘‘গত রাত ছিল সম্পূর্ণ নিদ্রাহীন। ইসরায়েলি ড্রোন আর যুদ্ধবিমান আকাশে ছিল সর্বক্ষণ, তারা ঘরবাড়ি ও অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে।’’
তিনি বর্ণনা করেন, ‘‘দক্ষিণ গাজার ইসরায়েল ঘোষিত তথাকথিত নিরাপদ এলাকা আল-মাওয়াসিতে এক বাবা কীভাবে রাতে তার সন্তানদের হারিয়েছেন। তিনি আমাদের বললেন, তার শিশুরা শান্তিতে ঘুমাচ্ছিল, তখনই ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র তাঁবুটি ভেদ করে ঢুকে পড়ে তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করে দেয়।’’
বুধবার সকাল থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৩৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, এর মধ্যে ১০ জন ত্রাণসামগ্রী খুঁজছিলেন বলে মেডিকেল সূত্র জানিয়েছে।
মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা
হামলা আরও তীব্র করার এ পরিকল্পনা কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রও সহায়তা দিচ্ছে। সর্বশেষ প্রস্তাবনায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, ধাপে ধাপে জিম্মি ও ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিনিময় এবং ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
কাতার জানিয়েছে, প্রস্তাবটি প্রায় হুবহু আগের সেই সংস্করণের মতো, যা ইসরায়েল একসময় মেনে নিয়েছিল। অন্যদিকে মিসর বলেছে, “এখন বলটা ইসরায়েলের কোর্টে।”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রস্তাবটি নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে গত সপ্তাহে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যে কোনো চুক্তির শর্ত হতে হবে—সব জিম্মিকে একসঙ্গে মুক্তি দিতে হবে এবং যুদ্ধ শেষ করতে হবে আমাদের শর্ত অনুযায়ী।
হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাভি বলেছেন, তাদের পক্ষ থেকে “চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনার দরজা পুরোপুরি খোলা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহু আবারও কি সেই দরজা বন্ধ করবেন, যেমন অতীতে করেছেন?”
এদিকে, যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা বাড়ছে এবং নিজ দেশেও নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়ছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর অন্তত ৬২ হাজার ৬৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/